১০ বছরে ৬ বদল: কেন ব্রিটেনকে বলা হচ্ছে ‘প্রধানমন্ত্রীখেকো দেশ’

ব্রিটেনের ৬ প্রধানমন্ত্রী
ব্রিটেনের ৬ প্রধানমন্ত্রী | ছবি : সংগৃহীত
1

লন্ডনের ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের বিখ্যাত চকচকে কালো দরজার ভবনটি প্রায় ৩০০ বছরের ইতিহাসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন হিসেবে বহু কিংবদন্তি নেতার আগমন-প্রস্থান দেখেছে। এই ভবনে উইনস্টন চার্চিল কাটিয়েছেন নয় বছর, আশির দশকে ‘আয়রন লেডি’ মার্গারেট থ্যাচার ছিলেন টানা ১২ বছর আর টনি ব্লেয়ার ছিলেন এক দশক। কিন্তু বিগত ১০ বছরে ডাউনিং স্ট্রিটের বাসিন্দাদের যেন বাক্সপেটরা গুছিয়ে বসারও সময় হচ্ছে না!

২০১৬ সাল থেকে শুরু করে গত এক দশকে ইতোমধ্যে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী এই বাসভবন ছেড়েছেন। শুধু গত চার বছরেই পরিবর্তন হয়েছেন চারজন। সর্বশেষ আজ (সোমবার, ২২ জুন) লেবার পার্টি থেকে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের নাটকীয় ঘোষণার পর প্রশ্ন উঠেছে, কেন ব্রিটেনের রাজনীতিতে এই অস্থিরতা? কেন বারবার বদলাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী?

ব্রিটিশ নির্বাচনি ব্যবস্থার ফাঁকফোকর

যুক্তরাজ্যের ভোটাররা যুক্তরাষ্ট্রের মতো সরাসরি তাদের সরকারপ্রধান বা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন না। ভোটাররা মূলত নিজ নিজ আসনের প্রতিনিধিদের ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ‘হাউস অব কমন্সে’ পাঠান। যে দল সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, সেই দলের নেতাই প্রধানমন্ত্রী হন।

আরও পড়ুন

এখানেই লুকিয়ে আছে মূল টুইস্ট। রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে অভ্যন্তরীণ ভোটের মাধ্যমে যেকোনো সময় তাদের দলীয় নেতা বদলে ফেলতে পারে—এমনকি সেই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন থাকলেও। যদি দলের সংসদ সদস্য বা সাধারণ কর্মীরা নেতার ওপর আস্থা হারান, তবে তাকে অনায়াসে সরিয়ে দেয়া সম্ভব। আর ক্ষমতাসীন দলের নেতৃত্ব হারালে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রধানমন্ত্রিত্বও চলে যায়। এই সাংবিধানিক ব্যবস্থার কারণেই কোনো সাধারণ নির্বাচন ছাড়াই গত ১০ বছরে বারবার ডাউনিং স্ট্রিটের চাবিকাঠি হাতবদল হয়েছে।

‘ব্রেক্সিট’ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বিশৃঙ্খল বিচ্ছেদ

বিশ্লেষকদের মতে, এই রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব ও অস্থিরতার মূল অনুঘটক হলো ‘ব্রেক্সিট’। ২০১৬ সালের বিতর্কিত গণভোটে ব্রিটিশ ভোটাররা অল্প ব্যবধানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইউ) ছাড়ার পক্ষে রায় দেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ইইউ-তে থাকার পক্ষে (‘রিমেইন’) প্রচার করায় গণভোটের ফল উল্টো আসায় ২০১৬ সালের জুলাইয়ে পদত্যাগ করেন।

ব্রেক্সিট শুধু ক্যামেরনকেই ডোবায়নি, এটি ব্রিটেনের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল কনজারভেটিভ ও লেবার পার্টির চিরন্তন ভোটব্যাংকেও ধস নামায়। ব্রেক্সিটের পক্ষের জনতাবাদী হাওয়া সামলাতে গিয়ে একে একে বলি হন একের পর এক প্রধানমন্ত্রী।

মে, জনসন, ট্রাস ও সুনাক: কনজারভেটিভদের একের পর এক পতন

থেরেসা মে (২০১৬–২০১৯): ক্যামেরনের পর ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ইইউ’র সঙ্গে চুক্তির শর্ত নিয়ে নিজের দলের ভেতরের তীব্র বিভাজনে কার্যত পঙ্গু হয়ে ২০১৯ সালে চোখের জলে বিদায় নেন তিনি।

বরিস জনসন (২০১৯–২০২২): ‘গেট ব্রেক্সিট ডান’ স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এলেও কোভিডকালে নিজের তৈরি লকডাউনের নিয়ম ভেঙে ডাউনিং স্ট্রিটে মদ-পার্টির আয়োজন করে ‘পার্টিগেট’ কেলেঙ্কারিতে জড়ান। পরবর্তীতে এক দলীয় নেতার যৌন নিপীড়নের তথ্য গোপন করার দায়ে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগে বাধ্য হন।

আরও পড়ুন

লিজ ট্রাস (২০২২): ব্রিটিশ ইতিহাসের সবচেয়ে স্বল্পস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী। দায়িত্ব পাওয়ার পর কোনো উৎস ছাড়াই বিশাল করছাড়ের ‘মিনি-বাজেট’ ঘোষণা করে বসেন তিনি। এতে ব্রিটিশ পাউন্ড ও শেয়ার বাজারে ধস নামলে মাত্র ৪৯ দিনেই ক্ষমতা ছাড়তে হয় তাকে।

ঋষি সুনাক (২০২২–২০২৪): প্রথম এশীয় বংশোদ্ভূত হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে প্রায় দুই বছর চললেও ইউক্রেন যুদ্ধ ও কোভিড-পরবর্তী জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট সামলাতে হিমশিম খান। ফলে ২০২৪ সালের নির্বাচনে কনজারভেটিভদের ১৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।

স্রোতের বিপরীতে লেবার পার্টি: স্টারমারও টিকলেন না দুই বছর

২০২৪ সালের জুলাইয়ে কনজারভেটিভদের হটিয়ে ভূমিধস জয় নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার। কিন্তু দুই বছর যেতে না যেতেই তার সরকারও টালমাটাল। একদিকে জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ব্যর্থতার অভিযোগ, অন্যদিকে একের পর এক কেলেঙ্কারি—বিশেষ করে দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের বন্ধু পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করা নিয়ে তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েন তিনি।

সর্বশেষ গত সপ্তাহের স্থানীয় কাউন্সিল ও উপ-নির্বাচনে লেবার পার্টির ভরাডুবির পর দলের ভেতরেই তার পদত্যাগের দাবি ওঠে। নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যান্ডি বার্নহামের উত্থানের মুখে দাঁড়িয়ে আজ সোমবার শেষ পর্যন্ত পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন স্টারমার।

তথ্যসূত্র: বিবিসি ও সিবিএস নিউজ

এনএইচ