জোড়াসাঁকোর জমিদার পরিবারের সন্তান হয়েও কবিকে টেনেছিল বাংলার সোঁদা মাটির গন্ধ। শিলাইদহ, শাহজাদপুর আর পতিসরের পথে পথে ঘুরে তিনি দেখেছিলেন কৃষকের অভাব, ঋণের বোঝা আর মহাজনি শোষণের নির্মম বাস্তবতা। তাই শুধু কবিতার ছন্দে নয়, তাঁর চিন্তায়ও জায়গা করে নেয় গ্রামের মানুষের জীবনসংগ্রাম।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, কৃষি আর গ্রামীণ জীবনের উন্নতি ছাড়া অর্থনৈতিক মুক্তি অসম্ভব। সেই ভাবনা থেকেই নওগাঁর পতিসরে নিজ উদ্যোগে আনেন কলের লাঙল। আধুনিক কৃষি শিক্ষা দিতে ছেলেকে পাঠান বিদেশে।
গবেষক ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক ড. চঞ্চল কুমার বোস বলেন, ‘পূর্ববঙ্গ এবং মধ্যবঙ্গ জুড়ে রবীন্দ্রনাথের যে উদ্যোগ, তার যে জমিদারী দেখাশোনা এবং এর পাশাপাশি এ গ্রামীণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য তিনি বহুমুখী চিন্তা এবং সেই চিন্তাকে তিনি বাস্তবে রূপদান করেছিলেন।’
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. সেলিম জাহান বলেন, ‘তার পুত্র রথীন্দ্রনাথ এবং জামাতা নগেন্দ্রনাথকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছিলেন কৃষিবিদ্যা অধ্যয়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান লাভের জন্য।’
আরও পড়ুন:
কবিগুরু মনে করতেন, শোষকের বিরুদ্ধে একা টিকে থাকতে পারবে না কৃষক সমাজ। তাই তিনি জোর দেন সমবায় ব্যবস্থার ওপর। কৃষকদের ঋণ সহায়তা দিতে প্রতিষ্ঠা করেন কৃষি ব্যাংক। এমনকি নোবেল পুরস্কারের অর্থও ব্যয় করেন সেই উদ্যোগে।
ড. চঞ্চল কুমার বোস আরও বলেন, ‘গ্রামীণ মহাজনী ঋণের হাত থেকে কৃষক সম্প্রদায়কে রক্ষা করা কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিলো। নোবেল পুরস্কারের প্রাপ্ত টাকা তিনি শান্তিনিকেতনের বিদ্যালয়ের নামে এই কৃষি ব্যাংকে রেখেছিলেন মহাজনের শোষণের হাত থেকে বাংলার সাধারণ কৃষকরা অনেকাংশে মুক্তি পেয়েছিল।’
কৃষির পাশাপাশি শিক্ষা আর আত্মশক্তিকেও তিনি দেখেছিলেন অর্থনৈতিক মুক্তির পথ হিসেবে। তাই ১৯২২ সালে শ্রীনিকেতনে গড়ে তোলেন ইনস্টিটিউট অব রুরাল রিকনস্ট্রাকশন। সেখানে কুটির শিল্প, কারিগরি শিক্ষা আর আত্মনির্ভরশীল গ্রামের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।
ড. সেলিম জাহান বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের স্বনির্ভর গ্রামকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক চিন্তার মূল কেন্দ্র ছিলো সমবায়। শান্তিনিকেতন যে শুধু পড়াশোনার জায়গা নয়, বরং তার অর্থনৈতিক ও সমাজ চিন্তার এক সম্মিলিত ফসল, তা এখানে প্রতিফলিত হয়েছে।’
শত বছর পর বদলে গেছে সময়, বদলেছে অর্থনীতির ভাষা। প্রশ্ন রয়ে গেছে, কতটা প্রাসঙ্গিক রবীন্দ্রনাথের সেই ভাবনা?
এ নিয়ে ড. চঞ্চল কুমার বোস বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ মনে করেছেন ভারতবর্ষের বা বাংলার যদি উন্নয়ন করতে হয় তাহলে, শুরুটা গ্রাম থেকেই করতে হবে। এ জায়গা থেকে আমার মনে হয় তার উদ্যোগের সঙ্গে আমাদের বর্তমান জীবনের প্রাসঙ্গিকতা এক জায়গাতেই আছে।’
টেকসই উন্নয়ন, স্থানীয় অর্থনীতি আর সমবায়ের কথা নতুন করে উচ্চারিত হয়, বিস্ময় জাগে, রবীন্দ্রনাথ দেখে গিয়েছিলেন ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে। তাই জন্মজয়ন্তীতে তাকে শুধু কবি হিসেবে নয়; একজন অর্থনৈতিক মুক্তি সন্ধানী প্রবাদপুরুষ হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চিরঞ্জীব। শুভ জন্মদিন কবিগুরু।





