৪০ বছরের পুরোনো ব্যবস্থা পেরিয়ে আধুনিক আকাশপথে বাংলাদেশ

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর | ছবি: এখন টিভি
0

চার দশকের পুরোনো ব্যবস্থা থেকে অত্যাধুনিক এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সেন্টার এটিএমসি ও থ্যালেস রাডার সিস্টেমের মাধ্যমে দেশের আকাশপথ ব্যবস্থাপনায় এসেছে বড় পরিবর্তন। স্বয়ংক্রিয় ফ্লাইট ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতসহ নজরদারি করা যাচ্ছে ৩৫০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত। আয় বেড়েছে ৩০ মিলিয়ন ডলারের বেশি। তবে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক এ ব্যবস্থার সুফল পুরোপুরি পেতে দ্রুত দক্ষ জনবল তৈরিতে নজর দিতে হবে।

শাহজালালের রানওয়েতে নামছে বিমান। আর নতুন এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারের স্ক্রিনে ভেসে উঠছে গতিবিধি। আকাশ থেকে মাটিতে নামার এই পুরো যাত্রাপথের নজরদারি আগেও ছিল, তবে বর্তমানে

বিশ্বমানের নজরদারি নিশ্চিতে চালু হয়েছে অত্যাধুনিক এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সেন্টার এটিএমসি।

ফরাসি প্রতিষ্ঠান থ্যালেস গ্রুপের তৈরি এই রাডার ও ব্যবস্থাটি ২০১৯ সালে পরিকল্পনা শুরু হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রায় ৯৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন হয়। যার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় চলতি বছরের ২০ এপ্রিল।

এর মধ্য দিয়ে প্রায় ৪০ বছর পুরোনো এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল ও ৩৫ বছর পুরোনো রাডারের সীমাবদ্ধতা কাটলো শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের। নতুন সিস্টেমে ২৪ ঘণ্টা সচল থেকে প্রতিটি উড্ডয়ন ও অবতরণকে আরও নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন হয়েছে।

সিভিল অ্যাভিয়েশনের মতে, নতুন এই রাডার ঢাকার আকাশসীমা থেকে ৩৫০ নটিক্যাল মাইল, অর্থাৎ প্রায় ৬৫০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত বিমান শনাক্ত করতে পারে। শুধু তাই নয়, চট্টগ্রামের রাডারও এখন এই সিস্টেমের সঙ্গে সমন্বিত। ফলে বঙ্গোপসাগরের ওপর ৪৫০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত ফ্লাইটের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছে।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সদস্য (এটিএম) এয়ার কমডোর মো. নূর-ই-আলম বলেন, ‘ভূপৃষ্ঠ থেকে অনেক নিচু উচ্চতায় যে বিমানগুলি উড়ে যায় অনেক দূরে, আগের রাডারে আমরা হয়তোবা সেটা পেতাম না। এখনকার রাডারে এটা মিস হওয়ার কোনো সুযোগ নাই। কারণ কি? আমার বাংলাদেশে ৮টা পয়েন্টে এটা এডিএস-বি বলে, অটোমেটিক ডিপেন্ডেন্ট সার্ভেইল্যান্স-ব্রডকাস্ট, এই জিনিসগুলো বসানো হয়েছে। যেটা রাডারের পারফরম্যান্সকে অগমেন্ট করে। যত বড় এয়ার স্পেস আমি নিতে পারবো, আমার তত বেশি উড়োজাহাজ আমি এই এয়ার স্পেসের ভেতরে নিয়ে আসতে পারবো। তত বেশি কিন্তু আমার রেভিনিউ হবে।’

এর ফলে গভীর সমুদ্রের আকাশপথেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে দেশের রাজস্ব আয় বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আগে যেখানে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ফ্লাইট প্ল্যান জমা ও যাচাই করতে সময় লাগত, এখন থ্যালেস ইউরোক্যাট রাডার ও এটিএমসি টাওয়ারের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াই স্বয়ংক্রিয়। যুক্ত হয়েছে এডিএস-বি ওএডিএস-সি প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে রাডারের সীমার বাইরেও নজরদারি সম্ভব। এমনকি পাইলটদের সঙ্গে শুধু ভয়েস নয়, টেক্সট মেসেজের মাধ্যমেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে। এছাড়া এআইডিসি প্রযুক্তির মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে ডাটা আদান-প্রদান এখন স্বয়ংক্রিয়।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১২ সালে বাংলাদেশের আকাশপথ ব্যবহার করত গড়ে ২৮৪টি ফ্লাইট, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫০ এ। কিন্তু পুরনো প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে সব ফ্লাইটকে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হতো না, এতে হারাতে হতো ফ্লাইং ওভার চার্জ থেকে সম্ভাব্য আয়।

আগে যেখানে বছরে প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলার আয় হতো, এখন নতুন ব্যবস্থায় তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭১ মিলিয়ন ডলারে। সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ আশা করছে, আগামী বছরগুলোতে এই আয় ৮ শতাংশের বেশি হারে বাড়বে।

এয়ার কমডোর মো. নূর-ই-আলম বলেন, ‘২০১২-১৩ সালের দিকে আমাদের ওভার ফ্লাইং রেভিনিউ যেটা আছে, এটা ছিল অ্যারাউন্ড ৪০ মিলিয়নের মতো। আর এখন যদি আমি বলি, ২০২৫ পর্যন্ত যদি ডাটা দেই, সেটা আমার অ্যারাউন্ড ৭১ মিলিয়ন। পার্শ্ববর্তী দেশে যে এফআইআর, ল্যান্ডলাইনের মাধ্যমে আমরা কিন্তু খবরগুলো পেতাম—এই ফ্লাইটটা এতোটার সময় এখানে যাবে, বাংলাদেশ বাউন্ডারিতে ঢুকবে, এতোটার সময় বের হয়ে যাবে। আমরা পাইলটকে কল দিয়ে না পেলেও আরেকজনের মাধ্যমে রিলে করতাম।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আধুনিক ব্যবস্থাকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে দক্ষ জনবল দরকার, তা না হলে থার্ড টার্মিনাল চালুর পর বাড়তি ফ্লাইট চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মুহাম্মদ মফিদুর রহমান বলেন, ‘তারা দেখা গেল তাদের ক্যাপাসিটি ৩০টা ট্রাফিক বা দিনে ২০০ ট্রাফিক কন্ট্রোল করে অভ্যস্ত। কিন্তু এখানে ১০০০ করা সম্ভব। তো এই ১০০০ ট্রাফিকের সিচুয়েশনে, এনভায়রনমেন্টে আমাদের এই কন্ট্রোলারদেরকে প্রশিক্ষণ করাতে হবে।’

এই থ্যালেস রাডার ব্যবস্থা মূলত বাণিজ্যিক এয়ারস্পেস নজরদারির জন্য চালু হলেও, এর সঙ্গে সামরিক নজরদারি যুক্ত করার কাজও চলছে। এ লক্ষ্যে থ্যালেসের সাথে যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠান আরটেমিস টেকনোলজির সঙ্গে যৌথভাবে কাজ এগিয়ে নেয়া হচ্ছে।

ইএ