শিক্ষক থেকে প্রভাবশালী মার্কিন ফিনান্সিয়ার এপস্টেইন
১৯৫৩ সালের ২০ জানুয়ারি নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে জন্ম জেফ্রি এপস্টেইনের। কলেজ ডিগ্রি সম্পন্ন না করেই তিনি ১৯৭০-এর দশকে ম্যানহাটনের নামী ডালটন স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। সেখানেই প্রভাবশালী পরিবারগুলোর সঙ্গে পরিচয় ঘটে।
১৯৮০-এর দশকে তিনি বিনিয়োগ ব্যবসায় প্রবেশ করেন। বেয়ার স্টার্নসে কাজ করার পর নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ভিক্টোরিয়া’স সিক্রেটের প্রতিষ্ঠাতা লেস ওয়েক্সনারের মতো ধনকুবের ছিলেন তার বড় ক্লায়েন্ট। নিউইয়র্ক, ফ্লোরিডা, নিউ মেক্সিকো ও ভার্জিন আইল্যান্ডসে গড়ে ওঠে তার বিলাসবহুল বাড়ি ও ব্যক্তিগত দ্বীপ।
এই সময়েই রাজনীতিক, সেলিব্রিটি ও বিজ্ঞানীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়—ডোনাল্ড ট্রাম্প, বিল ক্লিনটন, প্রিন্স অ্যান্ড্রু থেকে শুরু করে নামী অধ্যাপক ও গবেষকদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ে।
আরও পড়ুন:
এপস্টেইনের অপরাধের শুরু: অপ্রাপ্তবয়স্কদের ফাঁদে ফেলা (১৯৯০–২০০৫)
১৯৯০-এর দশক থেকে এপস্টেইনের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমতে থাকে। ভুক্তভোগীরা জানান, ‘ম্যাসাজ’-এর প্রলোভনে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ডেকে এনে যৌন নির্যাতন করা হতো। অনেক ক্ষেত্রে মেয়েদের দিয়ে অন্য মেয়েদের নিয়োগ করানো হতো—এক ধরনের পিরামিড পদ্ধতি অনুসরণ করে।
২০০৫ সালে ফ্লোরিডার পাম বিচে এক কিশোরীর অভিযোগের পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে। একে একে আরও বহু ভুক্তভোগী সামনে আসেন।
বিতর্কিত প্লি ডিল: বিচারব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ (২০০৬–২০০৯)
২০০৬ সালে এপস্টেইনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হলেও ২০০৮ সালে তিনি একটি বিতর্কিত প্লি ডিল বা সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে তুলনামূলক কম সাজা পান—১৮ মাসের কারাদণ্ড, তাও একাধিক বিশেষ সুবিধাসহ। সপ্তাহের ছয় দিন জেল থেকে বের হয়ে অফিসে যাওয়ার অনুমতি পান তিনি। এই চুক্তিকে পরে ‘সুইটহার্ট ডিল’ বলা হয়। ভুক্তভোগীদের না জানিয়ে করা এই সমঝোতা যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে সে সময় বড় প্রশ্ন তোলে।
পুনরুত্থান: দ্বিতীয় গ্রেপ্তার ও রহস্যজনক মৃত্যু (২০১৮–২০১৯)
২০১৮ সালে মার্কিন সংবাদমাধ্যম মিয়ামি হেরাল্ড–এর অনুসন্ধানী সিরিজ নতুন করে আলোড়ন তোলে। ২০১৯ সালে নিউইয়র্কে এপস্টেইনকে আবার গ্রেপ্তার করা হয় সেক্স ট্রাফিকিংয়ের অভিযোগে।
কিন্তু বিচার শুরুর আগেই ১০ আগস্ট কারাগারের সেলে তার মৃত্যু হয়। সরকারি তদন্তে বলা হয়, এটি আত্মহত্যা। তবে নিরাপত্তা ব্যর্থতা, ক্যামেরা অচল থাকা ও পাহারাদারের অবহেলা নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জন্ম দেয়।
আরও পড়ুন:
গিসলেন ম্যাক্সওয়েল: সহযোগীর সাজা (২০২০–২০২২)
এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী গিসলেন ম্যাক্সওয়েল ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হন। আদালতে প্রমাণিত হয়, তিনি কিশোরীদের নিয়োগ ও নির্যাতনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। ২০২২ সালে তাকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। মূলত গিসলেন ম্যাক্সওয়েলের বাবা ছিলেন রবার্ট ম্যাক্সওয়েল। তিনি একজন প্রভাবশালী ব্রিটিশ মিডিয়া ব্যবসায়ী ও প্রকাশক ছিলেন। রবার্ট ম্যাক্সওয়েল ১৯৯১ সালে রহস্যজনকভাবে সমুদ্রে পড়ে মারা যান।
এপস্টেইনের নথি উন্মোচন: সত্য কতটা প্রকাশ পেল? (২০২৩–২০২৬)
২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আদালত ও বিচার বিভাগ প্রায় ৩০ লাখের বেশি পৃষ্ঠার নথি প্রকাশ করে। এতে উঠে আসে—
- প্রায় ৩৫০ ভুক্তভোগীর বর্ণনা
- এপস্টেইনের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক
- প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য
- ফ্লাইট লগ এবং ই-মেইল যোগাযোগ
তবে বহুল আলোচিত ‘ক্লায়েন্ট লিস্ট’ বা ব্ল্যাকমেইল নেটওয়ার্কের কোনো শক্তপোক্ত প্রমাণ মেলেনি। অনেকের নাম উঠে এলেও অধিকাংশের বিরুদ্ধে অপরাধের কংক্রিট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে এপস্টেইন ফাইল ইস্যুতে এখনো যেসব প্রশ্ন রয়ে গেছে—
অভিযোগ তদন্তে কাঠামোগত ব্যর্থতা
এপস্টেইন মামলার সবচেয়ে বড় আলোচ্য বিষয় ছিল তদন্ত সংস্থাগুলোর ব্যর্থতা। ২০০৫–২০০৭ সালে ফেডারেল তদন্তে আন্তর্জাতিক শিশু পাচার ও যৌন শোষণের প্রাথমিক অভিযোগ প্রমাণিত হলেও তৎকালীন মার্কিন অ্যাটর্নি অফিস তা পূর্ণাঙ্গ মামলায় রূপ দেয়নি। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ স্বীকার করে, ভুক্তভোগীদের অধিকার সংক্রান্ত আইন যথাযথভাবে মানা হয়নি। নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা, প্রভাবশালী আইনজীবীদের চাপ এবং রাজনৈতিক প্রভাব তদন্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
এপস্টেইনের অর্থ ও প্রভাবের উৎস
নথিতে দেখা যায়, এপস্টেইনের আর্থিক কাঠামো ছিল জটিল ও অস্বচ্ছ। তার মূল বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রকৃত ক্লায়েন্টদের তালিকা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। বেশির ভাগ অর্থ এসেছে ব্যক্তিগত ট্রাস্ট ও অফশোর অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে। গবেষকরা বলছেন, এই অস্বচ্ছ অর্থব্যবস্থাই তাকে দীর্ঘদিন আইনের চোখ এড়িয়ে চলতে সহায়তা করেছে।
আরও পড়ুন:
একাডেমিক ও গবেষণা জগতের সঙ্গে সম্পর্ক
নথি অনুযায়ী, এপস্টেইন একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে অর্থ সহায়তা দিয়েছিলেন। এমআইটি, হার্ভার্ড ও বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রকল্পে তার অনুদানের তথ্য উঠে এসেছে। ২০০৮ সালে দণ্ডিত হওয়ার পরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার যোগাযোগ বজায় রেখেছিল। এতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নৈতিকতা ও দাতা যাচাই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
ফ্লাইট লগ ও দ্বীপ কেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড
প্রকাশিত নথিতে এপস্টেইনের ব্যক্তিগত বিমানের (যা ‘ললিতা এক্সপ্রেস’ নামে পরিচিত) ফ্লাইট লগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব রেকর্ডে বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়, যারা নিউইয়র্ক, ফ্লোরিডা ও ভার্জিন আইল্যান্ডের দ্বীপে যাতায়াত করেছেন। তবে আদালত বলেছে, কেবল ভ্রমণের তথ্য কোনো অপরাধ প্রমাণ করে না। সরাসরি নির্যাতনের প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত করা সম্ভব নয়।
ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও মার্কিন সরকারের অবস্থান
এপস্টেইনের মৃত্যুকে ঘিরে হত্যা ও গোপন নেটওয়ার্কের নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়ায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও মেডিকেল পরীক্ষকরা একাধিক প্রতিবেদনে বলেছেন, মৃত্যুর পেছনে অপরাধমূলক হস্তক্ষেপের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, এটি আত্মহত্যা এবং কারা কর্তৃপক্ষের অবহেলার ফল।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
এপস্টেইন কেলেঙ্কারি শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে তদন্তের জন্ম দেয়। বিশেষ করে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ব্রিটিশ রাজপরিবারকে বিব্রত করে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই মামলাকে শিশু পাচার ও যৌন সহিংসতা দমনে বৈশ্বিক সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করে।
রাজনীতি ও বিতর্ক
নথি প্রকাশকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র করে। কারা দায়ী, কারা রক্ষা পেল—এই প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে। ভুক্তভোগীরা এপস্টেইনের সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ পেলেও অনেকের মতে প্রকৃত বিচার এখনো অসম্পূর্ণ। এছাড়া বিশ্লেষকদের মতে, এপস্টেইন কেলেঙ্কারি যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থায় সংস্কারের দাবি জোরদার করেছে। ভুক্তভোগীদের অধিকার, প্লি ডিলের স্বচ্ছতা এবং প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে তদন্তে স্বাধীনতা—এই তিনটি বিষয় নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
আরও পড়ুন:
জেফ্রি এপস্টেইন কেলেঙ্কারি শুধু একজন অপরাধীর কাহিনি নয়; এটি ক্ষমতা, প্রভাব ও বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতার দীর্ঘ ইতিহাস। নথি প্রকাশের পরও নতুন করে বড় কোনো মামলা হয়নি। কিন্তু এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে একটি সতর্কবার্তা হয়ে রইল—অপরাধ যত প্রভাবশালী হাতেই হোক, সত্য চাপা দেয়া যায় না চিরদিন।
আরও পড়ুন:
