আজ (রোববার, ২৫ জানুয়ারি) বিদ্যুৎ ভবনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০ এর অধীনে সম্পাদিত চুক্তিসমূহ পর্যালোচনা জাতীয় কমিটি সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। কমিটি গত ২০ জানুয়ারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টার কাছে রিপোর্ট জমা দিয়েছে।
কমিটি জানায়, বিদ্যুৎ খাতে জরুরি আইনের দীর্ঘ প্রয়োগের ফলে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ও স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সুযোগে কয়েকটি বড় চুক্তিতে অতিমূল্য নির্ধারণ ও ঝুঁকি একতরফাভাবে রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।
কমিটির তথ্যমতে, আদানি পাওয়ারের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তিতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য অন্যান্য উৎসের তুলনায় ৪ থেকে ৫ সেন্ট বেশি নির্ধারিত হয়েছে।
চুক্তির শুরুতে প্রতি ইউনিট মূল্য ৮ দশমিক ৬১ সেন্ট থাকলেও বিভিন্ন শর্তের কারণে তা ২০২৫ সালে গিয়ে ১৪ দশমিক ৮৭ সেন্টে পৌঁছেছে। এর ফলে বছরে অতিরিক্ত ৪০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধ করতে হচ্ছে।
জাতীয় কমিটি জানায়, চুক্তিটি বহাল থাকলে আগামী ২৫ বছর ধরে এই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন ব্যয়ের সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
সংবাদ সম্মেলনে পর্যালোচনা কমিটির সদস্য ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ২০১১ থেকে ২০২৪ অর্থবছরের মধ্যে স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদকদের প্রতি সরকারের পরিশোধ ১১ গুণ বেড়েছে। কিন্তু বিপরীতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে মাত্র চার গুণ।
ফলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান দিচ্ছে এবং ২০২৫ অর্থবছরে এর বকেয়া দায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে।
তিনি বলেন, ঘাটতি পুষিয়ে নিতে পাইকারি বিদ্যুতের দাম ৮৬ শতাংশ বাড়াতে হলে বাংলাদেশে বিদ্যুতের দাম ভারত, চীন, ভিয়েতনাম ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় বেশি হয়ে যাবে। এতে রপ্তানি ও বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আরও পড়ুন:
তবে এই আর্থিক চাপ সামাল দিতে গিয়ে বিদ্যুতের দাম আরও বাড়ানো হলে দেশের শিল্পখাত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে বলে জানিয়েছে জাতীয় কমিটি।
সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় কমিটির সদস্য অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, কমিটি মনে করে আদানির চুক্তিতে সাংঘাতিক অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে। ওই তথ্যের কথা আদানিকে জানিয়ে দিয়ে তাদের কাছে উত্তর চাওয়া উচিত। এরপর দ্রুত সময়ের মধ্যে সিঙ্গাপুরে চুক্তি সংক্রান্ত সালিশি মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। বিলম্ব করলে আমাদের মামলা আইনি কারণে দুর্বল হয়ে যাবে। প্রাথমিকভাবে লন্ডনের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এত ভালো তথ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দুর্নীতি মামলায় বিরল।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চুক্তির সঙ্গে জড়িত ছিলেন এমন সাত-আট জনের অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এতে প্রায় কয়েক মিলিয়ন ডলারের লেনদেন হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ট্রাভেল ডকুমেন্টসহ অনেক তথ্য প্রমাণ দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) দেওয়া হয়েছে। তারা ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। তারা প্রমাণ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
জাতীয় কমিটির প্রধান হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিদ্যুৎ খাতের এই সংকট কোনো অনিবার্য বাস্তবতা নয় বরং নির্দিষ্ট নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ফল। এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে রাষ্ট্র কি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকি বহন করবে, নাকি জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী, কেপিএমজি বাংলাদেশ সাবেক প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা(সিওও) আলী আশরাফ।—বাসস




