নির্বাচনের হাওয়ায় তরুণ ভোটাররা: প্রতীক নয়, প্রার্থীই মূল বিবেচনা

নির্বাচন কমিশনের লোগো | ছবি: এখন টিভি
3

শহর থেকে গ্রাম, সবখানেই বইছে নির্বাচনি হাওয়া। যোগ্য প্রতিনিধি বাছাইয়ের হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত ভোটাররা। অভিজ্ঞদের পাশাপাশি এবার সমানতালে সক্রিয় তরুণ ভোটাররাও—ঘরে, ক্যাম্পাসে, এমনকি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। সর্বত্রই চলছে ভোটপূর্ব আলোচনা। সম-অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিজেদের প্রথম ভোট গুরুত্বপূর্ণ হবে, এমন প্রত্যাশা তরুণদের। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশ বিনির্মাণে নতুন ভোটারদের ভাবনায় এসেছে কি কোনো পরিবর্তন—সে প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে আলোচনায়।

চায়ের আড্ডা হোক কিংবা ক্যাম্পাসের করিডোর, তরুণদের আড্ডায় নির্বাচনই এখন প্রধান আলোচ্য। দল-মত, প্রতীক নাকি ব্যক্তির যোগ্যতা; কোনটি প্রাধান্য পাবে ভোটে, তা নিয়েই চলছে যুক্তিতর্ক।

আহসানুল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী জাওয়াদ নতুন ভোটার। তিনি চান উৎসবমুখর পরিবেশে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। জাওয়াদ বলেন, ‘এবার যেহেতু একটা ভোটিং কালচার আমরা পাচ্ছি, আমি মনে করি তরুণদের এখানে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়া উচিত। একজন নাগরিক হিসেবে রাজনৈতিক বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রত্যেকের দায়িত্ব।’

নির্বাচন নিয়ে তরুণদের এই আগ্রহ ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র; এক ক্যাম্পাস থেকে আরেক ক্যাম্পাসে, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। আলোচনা, বিতর্ক, বিশ্লেষণে সরব তরুণ প্রজন্ম।

সবখানে এখন নির্বাচনি আলোচনা |ছবি: এখন টিভি

জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম ফলই হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদের পক্ষে-বিপক্ষে গণভোট। ২০২৪ সালের সেই গণআন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল তরুণরাই, যাদের বড় একটি অংশ এবার প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। তাই এবারের নির্বাচন ঘিরে তরুণদের মধ্যে রয়েছে আগ্রহ, উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি প্রত্যাশা ও হতাশার মিশ্র অনুভূতি।

জুলাই মুভমেন্টের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতি তরুণ প্রজন্মের যে প্রত্যাশা ছিল, অনেক ক্ষেত্রেই তা পূরণ হয়নি—এমটাই ভাষ্য এক তরুণীর। তারা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত তরুণদের ম্যান্ডেট বোঝা এবং সেই অনুযায়ী রাজনীতি করা।

একই সঙ্গে তরুণ প্রার্থীদের কাছেও রয়েছে বাড়তি প্রত্যাশার কথা উঠেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ‘জেন-জি’ প্রজন্ম রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি সচেতন, এ কারণে তাদের সিদ্ধান্ত এবারের নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলবে বলেই ধারণা তাদের।

নারী ভোটারদের মধ্যেও হিসাব বদলেছে। সরকার আসে-যায়, আশ্বাসবাণী শোনা যায়; কিন্তু নারী ক্ষমতায়নের বাস্তব চিত্র খুব একটা বদলায়নি—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নিরাপত্তা শঙ্কা এবং নারীদের হয়রানির ঘটনাও তরুণীদের ভোটের সমীকরণে প্রভাব ফেলছে। তারা বলছেন, দল নয়, প্রার্থী দেখেই এবার ভোট দেবেন। নারী ক্ষমতায়নে যাদের বাস্তব ভূমিকা আছে, তাদের প্রতিই সমর্থন থাকবে।

আরও পড়ুন:

নির্বাচন কমিশনের হালনাগাদ তথ্য বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন। ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি নাগাদ দেশে ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা হবে ৫ কোটি ৫৬ লাখ ৫৩ হাজার ১৭৬; যা মোট ভোটারের ৪৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ এই বিশাল তরুণ ভোটার অংশই নির্ধারণ করতে পারে নির্বাচনের ফলাফল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম শামীম রেজা বলেন, ‘৬ কোটি একটি বিশাল সংখ্যা। তারা যদি যথেষ্ট উৎসাহী না হন ভোট দিতে, তাহলে ভোটার উপস্থিতির হার কমে যাবে; যা গণতন্ত্রের জন্য ভালো বার্তা নয়। এর সঙ্গে গণভোটও আছে, তাই সবারই আগ্রহ থাকা উচিত ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে।’

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে তরুণরা দল বা প্রতীক নয়; প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচয়, কাজ ও অবস্থান দেখেই সিদ্ধান্ত নেবেন। তারা মনে করছেন, তরুণদের ভোট পেতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও অনলাইন প্রচারণা এবারের নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই তৈরি হবে তরুণদের রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের বড় অংশ।

সমাজ বিশ্লেষক ড. রাশেদা রওনক খান বলেন, ‘বাংলাদেশই শুধু নয়, সারা পৃথিবী এখন ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদের দিকে যাচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটাররা এমন প্রার্থীকে খুঁজছেন, যিনি নতুন চিন্তা, নতুন সম্ভাবনা সামনে আনতে পারবেন।’

সব মিলিয়ে, এবারের নির্বাচন তরুণদের জন্য শুধু ভোট দেয়ার সুযোগ নয়; বরং রাষ্ট্র, রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দেয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।

এসএইচ