শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, শুধু চোখের জলে তওবা করাই যথেষ্ট নয়; হারাম উপার্জনের দায় ও গুনাহ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য একটি স্পষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করা আবশ্যক।
আরও পড়ুন:
১. হারামের দায়মুক্তি: মালিককে হক ফিরিয়ে দেওয়াই প্রথম শর্ত
যে সম্পদ ভুলভাবে অর্জন করা হয়েছে, তা অবিলম্বে তার প্রকৃত মালিকের কাছে (Rightful Owner) ফিরিয়ে দেওয়াই হলো তাওবার প্রথম এবং প্রধান প্রমাণ। যা আপনার হক নয় (যেমন—যৌতুকের টাকা, ঘুষের অর্থ, সুদের আয়), তা ফিরিয়ে দিতে হবে। অনেকেই ভাবেন, তওবা করলেই হারাম সম্পদ হালাল হয়ে যায়। কিন্তু না—প্রকৃত মালিককে তার হক (Haq) ফিরিয়ে না দিলে শুধু মুখের তওবায় হারাম কখনোই হালাল (Halal) হয় না। মালিককে ফিরিয়ে দেওয়াই হলো হারামের দায় থেকে মুক্ত হওয়ার একমাত্র পথ।
২. মালিককে খুঁজে না পেলে কী করণীয়?
অনেক সময় এমন হয় যে, হারাম আয় যার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল, তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না, তার পরিচয় হারিয়ে গেছে, অথবা টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো পথ খোলা থাকে না। এই পরিস্থিতিতে শরিয়তের নির্দেশ সে হারাম সম্পদ দান করে দিতে হবে (Must be Donated)। এই দান হবে নিজেদের পবিত্র করার একটি বাধ্যতামূলক পদক্ষেপ—ঠিক যেন হাতের ময়লা ঝেঁড়ে ফেলার মতো। এই দান সওয়াবের জন্য নয় (Not for Sawab/Reward)। কারণ যে সম্পদ আপনার মালিকানাধীন নয়, তার বিনিময়ে সওয়াব আশা করা ভুল। এটি কেবল আত্মশুদ্ধি এবং গুনাহ থেকে মুক্তি (Freedom from Sin) লাভের জন্য হৃদয়ের ভার নামানোর শেষ চেষ্টা।
আরও পড়ুন:
৩. হালাল উপার্জনের গুরুত্ব ও বরকত (Importance of Halal Earning and Barakah)
ইসলামে উপার্জন শুধু জীবিকা নয়—এটি মানুষের চরিত্র, পরিবার ও আখেরাতের ভিত্তি (Foundation of Afterlife)। হালাল উপার্জনে রয়েছে অফুরন্ত বরকত (Barakah)। হালাল উপার্জন মনকে শান্ত করে এবং ঘরে প্রশান্তি আনে। পক্ষান্তরে, হারাম আয়ে গঠিত হয় সন্তানের দেহ, যা সেই পরিবার থেকে বরকত পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়। যে ব্যক্তি হালাল-হারামের তোয়াক্কা না করে সম্পদ জমান, তার মাল বাড়লেও আল্লাহর রহমত ও বরকত তার জীবনের দরজায় আর কড়া নাড়ে না।
হালাল উপার্জনের গুরুত্ব ও বরকত: হাদিসের আলোকে বিধান (Barakah of Halal Earning)
ইসলামে হালাল উপার্জন (Halal Earning) কেবল জীবিকা নয়, বরং এটি ইবাদত এবং এতে রয়েছে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ বরকত (Barakah)। নবীজির (সা.) বাণী থেকে এই বিষয়ে নির্দেশিকা এবং গুরুত্ব নিচে তুলে ধরা হলো:
আল্লাহর রাসুল (সা.) হালাল ও হারাম উপার্জনের ফল সম্পর্কে স্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন:
আরবি পাঠ: فَمَنْ أَخَذَهُ بِحَقِّهِ وَوَضَعَهُ فِي حَقِّهِ فَنِعْمَ الْمَعُونَةُ هُوَ وَمَنْ أَخَذَهُ بِغَيْرِ حَقِّهِ كَانَ كَالَّذِي يَأْكُلُ وَلاَ يَشْبَعُ
বাংলা উচ্চারণ: ফামান আখাযাহু বিহাক্কিহী ওয়া ওয়াদ্আহূ ফী হাক্কিহী ফানি'মাল মা'ঊনাহ হুয়া, ওয়া মান আখাযাহু বিগাইরি হাক্কিহী কা-না কাল্লাযী ইয়া'কুলু ওয়ালা ইয়াশবাউ।
বাংলা অর্থ: ‘যে ব্যক্তি তা [সম্পদ] সৎ পন্থায় উপার্জন করল, সে সে পথেই থাকল। সে কতই না সাহায্য সহযোগিতার সুযোগ লাভ করে। আর যে ব্যক্তি তা অসৎ পন্থায় উপার্জন করল তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে—এক ব্যক্তি খাচ্ছে অথচ পরিতৃপ্ত হতে পারছে না।’ (মুসলিম ২৩১১)
আরও পড়ুন:
অন্যান্য ইবাদতের পাশাপাশি হালাল রুজি অনুসন্ধান করাও মুমিনের জন্য বাধ্যতামূলক:
আরবি পাঠ: طَلَبُ كَسْبِ الْحَلَالِ فَرِيضَةٌ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ
বাংলা উচ্চারণ: তলাবু কাসবিল হালা-লি ফারীদাতুন বা'দাল ফারীদাহ।
বাংলা অর্থ: ‘অন্যান্য ফরজ কাজ (Fard) আদায়ের সঙ্গে হালাল রুজি-রোজগারের ব্যবস্থা গ্রহণ করাও একটি ফরজ।’ (বায়হাকি ৪৬০)
স্বামীর হালাল উপার্জনের মাধ্যমে পরিবারকে ভরণপোষণ করার জন্য তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ সওয়াব (Sawab) লাভ করেন:
আরবি পাঠ: وَلِزَوْجِهَا أَجْرُهُ بِمَا كَسَبَ
বাংলা উচ্চারণ: ওয়া লিযাওজিহা আজরুহু বিমা কাসাব।
বাংলা অর্থ: ‘স্বামীর জন্য তার উপার্জনের কারণে সওয়াব রয়েছে।' (বুখারি ১৪২৫)
আরও পড়ুন:
নিজ হাতে উপার্জন নবীদের সুন্নতনিজ হাতে সৎ ও পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করা নবী-রাসুলদের (আ.) সুন্নাত:
আরবি পাঠ: مَا أَكَلَ أَحَدٌ طَعَامًا قَطُّ خَيْرًا مِنْ أَنْ يَأْكُلَ مِنْ عَمَلِ يَدِهِ وَإِنَّ نَبِيَّ اللهِ دَاوُدَ عَلَيْهِ السَّلاَم كَانَ يَأْكُلُ مِنْ عَمَلِ يَدِهِ
বাংলা উচ্চারণ: মা- আকালা আহাদুন তা'আ-মান কাত্তু খাইরাম মিন আন ইয়া'কুলা মিন আমালি ইয়াদিহী, ওয়াইন্না নাবিয়্যালাহি দাঊদা আলাইহিস সালা-ম কা-না ইয়া'কুলু মিন আমালি ইয়াদিহী।
বাংলা অর্থ: ‘নিজ হাতে উপার্জিত খাবারের থেকে উত্তম খাবার কখনো কেউ খায় না। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন।' (বুখারি ২০৭২)
আরও পড়ুন:
হালাল রিজিক (Halal Rizq) অনুসন্ধান করা কেবল একটি ঐচ্ছিক কাজ নয়, বরং অন্যান্য ইবাদতের পরই এটি মুমিনের জন্য একটি ফরজ দায়িত্ব (Fard Obligation)। সম্পদ অর্জনের পথ যদি সৎ ও ন্যায়ানুগ (Righteous) হয়, তবে তাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকত (Barakah) আসে, যা হৃদয়কে প্রশান্তি দেয় এবং পরিবারকে পবিত্র রাখে। পক্ষান্তরে, অসৎ উপার্জনে বাহ্যিক প্রাচুর্য দেখা গেলেও তাতে কোনো তৃপ্তি থাকে না এবং তা জীবন থেকে বরকত কেড়ে নেয়।
তাই, নিজ হাতে উপার্জন করা এবং সর্বদা হালাল উপার্জনের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া—যা নবী-রাসুলদের সুন্নত (Sunnah)—তা নিশ্চিত করাই হলো দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতার মূল চাবিকাঠি (Key to Success)।





