গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো নানা বিতর্কিত ঘটনার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনার মুখে ছিল র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র্যাব। ৫ আগস্টের পর জোরেশোরে দাবি ওঠে বাহিনীটি বিলুপ্তির। তবে, বিএনপি সরকার গঠনের পর, র্যাব পুনর্গঠন করে হচ্ছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-এসআইআরবি। নতুন এই বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেই সামনে এসেছে এক নতুন বিধান।
অতীতের বিভিন্ন আলোচিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে এবং বাহিনীর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে গঠিত হচ্ছে একটি বহুমুখী অভিযোগ প্রতিকার কমিটি।
নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুন কিংবা ঝালকাঠিতে লিমনকে গুলি করার মতো ঘটনাগুলো র্যাবকে নানা সময় কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিল। এমনকি ২০১৮ সালের নির্বাচনকালীন বিভিন্ন বিতর্কও কম আলোড়ন সৃষ্টি করেনি। এসব ঘটনায় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছিল প্রশ্ন।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন বিধানে প্রতিকার কমিটি গঠনের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। যার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—দুটি বাহিনীই পুলিশের অধীনে পরিচালিত হলেও, এসআইআরবি বা প্রস্তাবিত বাহিনীতে যুক্ত হচ্ছে স্বতন্ত্র আইন, যেখানে র্যাবের স্বতন্ত্র এমন আইন ছিলো না। আর এর মাধ্যমেই জবাবদিহিতার আওতায় আসবে এসআইআরবি।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক এম জেড ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, ‘শুধু নাম পরিবর্তন না। নাম পরিবর্তন হচ্ছে, আর আইনি পরিবর্তন যেখানে অবকাঠামোগত পরিবর্তন হচ্ছে, সে অবকাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমেও কিন্তু এখানে আইনের যে সুশাসন এবং জবাবদিহিতা দুইটাকেই সুনিশ্চিত করা হচ্ছে। শুধু বাহিনীর নাম পরিবর্তন হয়ে গেলেই যে অটোমেটিক এ নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে বিষয়টি আসলে এমনও না। তাই এই পুরো বিষয় টি কিন্তু একটি চলমান প্রক্রিয়া, যেটা হয়তো সময়ই বলে দিবে যে এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় কি এই বাহিনী পড়বে না নতুন বাহিনী পড়বে না।’
আরও পড়ুন:
বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য এ ধরনের বহুমুখী কমিটি সময়োপযোগী হলেও, এর সঠিক বাস্তবায়ন এবং কার্যকারিতা নিশ্চিত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান বলেন, ‘গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অনুপস্থিতির কারণেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এরকম একটা মনস্টারে পরিণত হয়। সরকার যদি চায় যে তার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলি যথাযথ নিয়ম মেনে কাজ করবে এবং তারা যদি নিয়মবহির্ভূত কাজ করে তাহলে তাদের শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। এরকম একটা ব্যবস্থা থাকলে কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো খারাপ কাজ করতে পারে না।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল আইন প্রণয়ন নয়, বরং এর সঠিক ও নিরপেক্ষ প্রয়োগই পারে র্যাব বা যেকোনো নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞানের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, ‘র্যাব পোশাক পরিবর্তন করতেছে বা নাম পরিবর্তন করতেছে বা অনেকগুলো আইন পরিবর্তন করতেছে, তার তুলনায় আমাদেরকে দেখতে হবে—আসলে এগুলো কতখানি আমরা বাহিনীর সদস্যদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারতেছি, অর্থাৎ তাদের ট্রান্সপারেন্সির জায়গা থেকে কতটুকু আমরা রিলায়েবল হতে পারতেছি, এটা সবচাইতে বেশি মুখ্য বিষয়। প্রিভিয়াসলি যেহেতু অনেক মানুষের র্যাব সম্পর্কে একটু ব্যাড এক্সপেরিয়েন্স আছে, সব কিছু নলেজে নিয়ে এমনভাবে কাজটা করা উচিত, যেন জনমন বিশ্বাস করে আসলেই বাহিনীটি অনেক বেশি ভালো করবে।’
পুরোনো নেতিবাচক ভাবমূর্তি মুছে নতুন এই আইনি রূপরেখা জনগণের কতটা আস্থা ফেরাতে পারবে —এখন সেটাই দেখার বিষয়।




