মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর; এখনও ক্ষতচিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন শিক্ষার্থী-স্বজনরা

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছরপূর্তি আজ
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছরপূর্তি আজ | ছবি: এখন টিভি
0

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর আজ। গেলো বছরের এই দিন রাজধানীর উত্তরা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ভবনে বিমান বিধ্বস্তে প্রাণ হারান শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীসহ ৩৬ জন, যার মধ্যে ২৮ জনই শিক্ষার্থী। বছর পেরুলেও ভয়াবহ দিনটির ভয়াবহ স্মৃতি এখনও তাড়া করে ফেরে শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ স্বজন হারানো পরিবারগুলোকে। মাইলস্টোন দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা এখন কেমন আছেন?

গত এক বছরে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্যাম্পাসটি অনেকটাই স্বাভাবিক হওয়ার পথে। ক্লাসেও বেশ মনোযোগী শিক্ষার্থীরা। তবে ২০২৫ এর ২১ জুলাই বিমান দুর্ঘটনার বিভীষিকাময় দিনটি মাঝে মাঝেই তাদের সামনে ভেসে ওঠে দুঃস্বপ্নের মতো, মনের অজান্তেই ভিজে যায় চোখ। এখনও মাঝে মাঝে আকাশে বিমানের শব্দে আঁতকে ওঠেন শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা।

সেদিনের ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনাটিতে ২৮ জন শিক্ষার্থীসহ প্রাণ হারিয়েছিলেন ৩৬ জন। আর বিভিন্ন তথ্যমতে আহতের সংখ্যা ছিলো ১৬৫। যার মধ্যে অনেকেই সুস্থ হয়ে ফিরেছেন ক্লাসে। দুর্ঘটনায় হারানো সহপাঠীদের মনে ধারণ করেই প্রতিনিয়ত স্কুলে আসছে তারা, যে চেষ্টাটা কেবল নিজেদের ফিরে পাবার।

সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘সেদিন হঠাৎ করে একটা তাপ এসে হাতে লাগার পর আমি জ্ঞান হারাই। এসময় সবার চিৎকার শুনে পেছনে ফিরে দেখি, আমার অনেক বন্ধু ও আপুদের হাতের চামড়া ঝলসে পড়ছে। কারও ব্যাগে আগুন লেগেছে।’

এক শিক্ষক বলেন, ‘তাদের কথা মনে পড়লেই মনটা খারাপ হয়ে যায়, যে আমাদের কলিগ ছিলো; কত ছোট ছোট বাচ্চারা ছিলো!’

আরেক শিক্ষক বলেন, ‘ওই বাচ্চারা এসে জড়িয়ে ধরতো, সেই বাচ্চাগুলো আজ নেই। আমরা আসলে ওদের কথা প্রতিদিন মনে করি।’

দুর্ঘটনায় নাফি ও নাজিয়া নামের দুই সন্তান হারিয়ে নিঃসন্তান হওয়া পিতা আশরাফুলের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, এক বছরেও স্বাভাবিক হতে পারেননি তিনি ও তার পরিবার। এখনও অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সন্তানদের স্মৃতি বয়ে বেড়ান তিনি। তার মতো অনেকেই প্রিয় সন্তানকে হারিয়ে আজও দিশেহারা। সরকারের কাছে তাদের কেবল একটাই চাওয়া, হারানো সন্তানদের যথাযথ মর্যাদা ও সঠিক বিচার।

আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘আজকে কেউ যদি দায় স্বীকার করতো, কারও যদি শাস্তি হতো, শাস্তি হলে তো আমরা আমাদের বাচ্চাদের ফেরত পাবো না। তবে শাস্তিটা এজন্যই হওয়া উচিত যে, ভবিষ্যতে যেন এই ধরনের ঘটনা না ঘটে।’

নিহত আরেক শিক্ষার্থী জুনায়েদ হাসানে পিতা মো. আসলাম বলেন, ‘কখনোই আমাদের কোনো খোঁজখবর নিতে আসেনি, কোনোকিছু বলেনি। আমরা এটার যে সুষ্ঠু বিচার চেয়েছিলাম, তদন্ত চেয়েছিলাম, সেটাও আমাদের দেয়া হয়নি।’

অভিযোগ আছে, প্রথমদিকে সবাই খোঁজ-খবর নিলেও এখন আর ভুক্তভোগী পরিবারের খোঁজ রাখছে না কেউ। সরকারের দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলোও বাস্তবে আর আলোর মুখ দেখেনি। এমনকি দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া স্কুলকর্মী মাসুমা বেগমকে প্রতিষ্ঠান থেকেও কোনো সহযোগিতা করা হয়নি বলে দাবি তার স্বামীর।

নিহত স্কুলকর্মী মাসুমা বেগমের স্বামী সেলিম হোসেন বলেন, ‘গত জুলাইয়ের ২১ তারিখে যে ঘটনাটা ঘটেছে, এর পরে আমার সাথে সরকার বা স্কুল কর্তৃপক্ষ থেকে কোনোরকম যোগাযোগ করা হয়নি।’

যদিও দিনটিকে স্মরণ করতে দোয়া মাহফিল ও মাইলস্টোনের সব ক্যাম্পাস বন্ধ রাখবে কর্তৃপক্ষ। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি পুনর্স্থাপনের কথা ভাবছে তারা। তবে ভবন পুনর্স্থাপন বা মেরামত করা হলেও প্রিয়জন হারানোর বিভীষিকাময় সেই ভয়ঙ্কর দিনটি মন থেকে সেরে উঠতে ঠিক কত দিন, মাস বা বছর লাগবে? নাকি সারাজীবন এই ক্ষত বয়ে বেড়াতে হবে স্বজন, সহপাঠী ও সহকর্মী হারানো মানুষগুলোকে?

এসএইচ