প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে শ্রম অভিবাসনের সামগ্রিক চিত্র, গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের ভূমিকা, আইন ও নীতিগত পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে অভিবাসীদের সুরক্ষা পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ করণীয় তুলে ধরা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট আলোকচিত্রী ও লেখক ড. শহিদুল আলম। মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ড. তাসনিম সিদ্দিকী, ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক, রামরু।
ড. শহিদুল আলম বলেন, ‘অভিবাসীদের শুধু সংখ্যার হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। যে অভিবাসীদের থেকে সরকার আয় করে, তাদের জীবন সহজ করার জন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেই। অথচ আমরা বৈষম্যহীন দেশের স্বপ্ন দেখি।’
তিনি বলেন, ‘অভিবাসীদের ভোটগ্রহণের জন্য আমরা এখনো পোস্টাল ব্যালটের কথা বলছি, যা ডিজিটাল যুগের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’
ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, ‘২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে শ্রম অভিবাসনের সংখ্যা প্রায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালে মোট ৬২ হাজার ৩১৭ জন নারী কর্মী বিদেশে গেছেন যা মোট অভিবাসনের প্রায় ৫.৫ শতাংশ। তবে ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে নারী অভিবাসনের সংখ্যা প্রায় ৪০.৯ শতাংশ কমেছে। গন্তব্য দেশের দিক থেকে দেখা যায়, কার্যত প্রায় ৯০ ভাগ বাংলাদেশি কর্মী মাত্র পাঁচটি দেশে অভিবাসীত হয়েছেন এবং মোট অভিবাসীর ৬৭ শতাংশ (৭,৫৪,৩৬৯ জন) সৌদি আরবে গেছেন। রেমিট্যান্স প্রবাহে ২০২৫ সালে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে। এ বছরে রেমিট্যান্স দাঁড়িয়েছে ৩২.৮২ বিলিয়ন ডলার।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতে অভিবাসী বাংলাদেশিদের বিদেশে অবস্থানরত অবস্থায় ভোট দেয়ার সুযোগ তৈরির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১১ লাখ ১৮ হাজার ৩৪৪ জন অভিবাসী পোস্টাল ভোটিংয়ে অংশগ্রহণের জন্য নিবন্ধিত হয়েছেন। বাজেটে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ বিগত অর্থবছরের চেয়ে এবার বাজেট কমিয়ে আনা হয়েছে। গতবছর এক হাজার ১৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিলো এবার সেটা ৮৫৫ কোটি টাকা। যেখানে অর্থনীতি বিষয়ক শ্বেতপত্রে অভিবাসন খাতে বাজেট বরাদ্দ ০.০৮ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে বাড়িয়ে আনার সুপারিশ করা হয়েছিল।
আরও পড়ুন:
অর্থনীতি বিষয়ক শ্বেতপত্রে অভিবাসন খাতে বাজেট বরাদ্দ ০.০৮ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে বাড়িয়ে আনার সুপারিশ করা হয়েছিল। অনিয়মিত অভিবাসনের ক্ষেত্রেও বড় ঝুঁকির চিত্র দেখা যায়। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ হাজার ৪৭৬ জন বাংলাদেশি অভিবাসী সমুদ্রপথে ইতালির উপকূলে পৌঁছেছেন। যা চলতি বছরে ইতালিতে আগত দেশগুলোর অভিবাসীদের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন বলেন, ‘অভিবাসন খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে বিএমইটি ও মন্ত্রণালয়ের কাঠামোগত সংস্কার, অনিয়ম ও অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং রিক্রুটিং এজেন্সির কঠোর তদারকি প্রয়োজন। একই সঙ্গে নারী অভিবাসীর সুরক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।’
এছাড়া সৌদি আরবে তাকামল পরীক্ষা বাধ্যতামূলক তাই মাঠ পর্যায়ে পর্যায়ে পর্যাপ্ত কেন্দ্র, প্রশিক্ষক ও লোকবল বাড়ানো ও মনিটরিংয়ের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছে।
প্রতিবেদনটি অভিবাসীদের সুরক্ষা জোরদারে কয়েকটি সুপারিশ দিয়েছে। অভিবাসন খাতে সুশাসন ও সেবার মানোন্নয়নে বিএমইটিকে একাধিক পরিদপ্তরবিশিষ্ট অধিদপ্তরে রূপান্তর, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য পৃথক ক্যাডার সার্ভিস চালু এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তহবিল শুধুমাত্র অভিবাসীদের প্রত্যক্ষ সেবায় ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের চেয়ারম্যান নিয়োগের পূর্ববর্তী ব্যবস্থা পুনর্বহাল, ব্যাংক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, স্বার্থের সংঘাত এড়াতে সংসদ সদস্যদের রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স স্থগিতকরণ এবং অভিবাসন খাতে জাতীয় বাজেটের এক শতাংশ বা বার্ষিক রেমিট্যান্সের পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন রামরুর প্রোগ্রাম ডিরেক্টর মেরিনা সুলতানা, প্রজেক্ট ম্যানেজার রাবেয়া নাসরিন, সিনিয়র আইটি অ্যান্ড কমিউনিকেশন অফিসার পারভেজ আলম, লিগ্যাল অফিসার মাহমুদুল হাসান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ রাশেদ আলম।





