আসামিদের অনুপস্থিতিতে আজ (মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর) এ রায় দেয়া হয়। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই বিচারক হলেন মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
এদিন কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মূল দল আওয়ামী লীগেরও তিন নেতার বিরুদ্ধে দেয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ডের রায়। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য মোহাম্মদ এ আরাফাত।
জুলাই অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এটি ছিল সপ্তম রায়। এর আগে ছয়টি মামলার রায়ে ৬১ আসামিকে সাজা দেয়া হয়। দণ্ডিতদের মধ্যে ভারতে আশ্রয় নিয়ে থাকা আওয়ামী লীগ সভাপতি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও রয়েছেন। এবার দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও একই দণ্ড পেলেন। তিনিও ভারতে রয়েছেন।
এদিনের রায়ে সাত আসামির বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন দমনে হত্যা ও নির্যাতন চালানোর নির্দেশ এবং উসকানির অভিযোগ আনা হয়েছিল।
শেখ ফজলে শামস পরশের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশনা অনুযায়ী আন্দোলন নস্যাতের জন্য নিয়ন্ত্রিত আওয়ামী যুবলীগকে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন তিনি।
পরশের নির্দেশে যুবলীগ নেতাকর্মীরা আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশিয় অস্ত্র নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালান। এতে নিরীহ ও নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা নিহত ও গুরুতর আহত হন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও ১৪-দলীয় সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীর হামলায় ১ হাজার ৪০০-এর বেশি ছাত্র-জনতা নিহত এবং ২৫ হাজারের বেশি আহত হন। এসব হত্যা ও নির্যাতনের অন্যতম নির্দেশদাতা ও নেতৃত্বে ছিলেন পরশ।
মাইনুল হোসেন খানের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১২ জুলাই সিলেট সিটি করপোরেশনের একটি অনুষ্ঠানে আন্দোলনকারীদের কটাক্ষ করেন তিনি। আন্দোলন প্রতিহত করতে যুবলীগ নেতাকর্মী ও অনুসারীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন।
ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশ ও প্ররোচনায় ১৯ জুলাই মাইনুল অস্ত্র হাতে মিরপুর এলাকায় মহড়া দেন এবং আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণ করেন। সেদিন তার নেতৃত্ব ও নির্দেশে মিরপুরে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে রুস্তম, আসিফ ইকবালসহ ২৬ জনকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া মাইনুলের উপস্থিতি ও তত্ত্বাবধানে ৪ আগস্ট মিরপুরে শাহরিয়ার হাসানসহ ১২ জন এবং ৫ আগস্ট মাহফুজুল আলমসহ ২০ জনকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ আনা হয়েছে। তার বিরুদ্ধেও ১ হাজার ৪০০ জনকে হত্যা ও ২৫ হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে জখম করার অভিযোগ রয়েছে।
সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে ছাত্রলীগের এক সমাবেশে আন্দোলনকারীদের হুমকি ও উস্কানি দেন তিনি। ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশনা বাস্তবায়নে সারা দেশে ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীদের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে হামলায় প্ররোচনা ও নির্দেশ দেন সাদ্দাম।
১৫ জুলাই সাদ্দাম বলেছিলেন, ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করবে।’ পরদিন আন্দোলনকারীদের ‘দেখে নেয়ার’ হুমকি দেন তিনি।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এরপর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের সশস্ত্র গোষ্ঠী সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। ১৬ জুলাই সারা দেশে ছয়জন নিহত হন। পরদিন আহত হন চার শতাধিক শিক্ষার্থী।
ইনানের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়েছে, আন্দোলন দমনে তিনি বিভিন্ন পরিকল্পনা ও নির্দেশনা দেন এবং অর্থ গ্রহণ করেন। ১৩ জুলাই মধুর ক্যান্টিনে তিনি হিংসাত্মক ও উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন এবং আন্দোলনকারীদের ভয়ভীতি দেখান। ১৫ জুলাই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রতিহত করার নির্দেশ দেন তিনি।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ইনানের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ এবং ঢাকা কলেজ কমিটির সদস্যরা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালান। ১৬ জুলাই রাজু ভাস্কর্যে সাদ্দামের দেয়া হুমকিকেও সমর্থন করেন ইনান। ওই দিন সারা দেশে ছয়জন নিহত হন।
গত ১৮ ডিসেম্বর এ মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন বিভাগ। বিচার শুরুর পর গত ২ আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৯ জন সাক্ষ্য দেন।
উল্লেখ্য, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে আন্দোলন গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে রক্তাক্ত আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এর পরিণতিতে ওই বছরের ৫ আগস্ট ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা।





