ইউরোপজুড়ে জনঅসন্তোষের নেপথ্যে ঋণসংকট, সুদ গুনতেই ফুরাচ্ছে বাজেট

ইউরো ব্যাংকনোট
ইউরো ব্যাংকনোট | ছবি: সংগৃহীত
0

জীবনযাত্রার চড়া ব্যয়, মজুরি সংকট, বাসস্থানের চড়া মূল্য এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাজেট কাটছাঁটের প্রতিবাদে কয়েক সপ্তাহ ধরে ইউরোপের দেশে দেশে রাস্তায় নেমেছেন লাখো মানুষ। ফ্রান্স থেকে শুরু করে বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে ছড়িয়ে পড়া এই বিক্ষোভের নেপথ্যে রয়েছে এক গভীর অর্থনৈতিক বাস্তবতা। বছরের পর বছর মাত্রাতিরিক্ত ঋণের ওপর নির্ভরশীল থাকায় বিশ্বের সরকারগুলোর ওপর ঋণের বোঝা এখন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ঋণের পরিমাণ এখন পৌঁছেছে ৩৬৫ লাখ কোটি (৩৬৫ ট্রিলিয়ন) ডলারে। সেই ঋণের চড়া সুদ মেটাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনমানের বাজেটে টান পড়ছে।

বিক্ষোভের পেছনে সরকারের অর্থনৈতিক সংকট কতটা?
ইউরোপে চলমান গণবিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ফ্রান্স। দেশটিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি স্কুল-কলেজের বেহাল দশার প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছেন কয়েক লাখ শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিক। তবে নাগরিকদের এই ক্ষোভ মেটানোর মতো আর্থিক সক্ষমতা সরকারের দিনে দিনে সংকুচিত হয়ে আসছে। ফ্রান্সে ঋণ নেয়ার খরচ এখন ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকার যত বেশি অর্থ সুদের পেছনে খরচ করছে, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পেনশনের মতো জনকল্যাণমূলক খাতে বরাদ্দ ততটাই কমে যাচ্ছে। ফলে রাজপথের ক্ষোভের সঙ্গে সরকারের আর্থিক ঋণসংকটের সম্পর্ক অত্যন্ত সরাসরি।

সরকার কীভাবে ঋণ নেয়?
সাধারণ মানুষ যেভাবে ব্যাংকে গিয়ে ঋণ নেয়, সরকারের ঋণ নেয়ার প্রক্রিয়া কিছুটা ভিন্ন। সরকার সাধারণত সাধারণ বিনিয়োগকারী, ব্যাংক ও অন্যান্য দেশের কাছে বন্ড বা ঋণপত্র বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকার প্রতিশ্রুতি দেয় যে নির্দিষ্ট মেয়াদে বিনিয়োগকারীকে নির্দিষ্ট হারে সুদ দেয়া হবে এবং মেয়াদ শেষে মূল অর্থ ফেরত দেয়া হবে। উদাহরণ হিসেবে, একটি সরকার যদি ১০ বছর মেয়াদি ১০০ ইউরোর একটি বন্ড বিক্রি করে এবং বার্ষিক সুদ ধরা হয় আড়াই শতাংশ, তবে বিনিয়োগকারী প্রতিবছর আড়াই ইউরো করে ১০ বছরে ২৫ ইউরো সুদ পাবেন এবং মেয়াদ শেষে মূল ১০০ ইউরো ফেরত পাবেন। কিন্তু বাজারে সুদের হার বেড়ে ৫ শতাংশ হলে সরকারকে একই পরিমাণের জন্য দ্বিগুণ অর্থাৎ ৫০ ইউরো সুদ গুনতে হয়। সরকারের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও বিশ্বস্ততার ওপর ভিত্তি করে এই সুদের হার ওঠানামা করে।

ঋণ নেয়ার ব্যয় বাড়লে কেন বিপদ বাড়ে?
ঋণপত্রের বাজারমূল্য কমে গেলে তার বিপরীতে সুদের হার বা ইল্ড বেড়ে যায়। কোনো পরিবারের ঋণের কিস্তির হার বেড়ে গেলে যেমন তাদের অন্যান্য খরচ কমাতে হয়, সরকারের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। ইউরোপীয় অঞ্চলের বড় অর্থনীতির দেশগুলোতে ১০ বছর মেয়াদি ঋণের সুদের হার দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফ্রান্সকে এখন ১০ বছর মেয়াদি ঋণের জন্য প্রায় ৫ শতাংশ হারে সুদ গুনতে হচ্ছে, যেখানে জার্মানির ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। এর অর্থ হলো, ঋণদাতারা এখন ফ্রান্সকে ঋণ দেয়াকে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন এবং বেশি সুদ দাবি করছেন। ফলে ইউরো সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ইতালি ও গ্রিসের চেয়েও এখন ফ্রান্সকে বেশি খরচে ঋণ নিতে হচ্ছে।

কোন দেশগুলোর ঘাড়ে ঋণের বোঝা সবচেয়ে বেশি?
বিশ্বে সরকারি ঋণের অঙ্কে সবার ওপরে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির মোট সরকারি ঋণ ৪১ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার, যা তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১২৭ শতাংশ। বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারের আধিপত্য থাকায় যুক্তরাষ্ট্র সহজে ঋণ নিতে পারলেও তাদের এই সক্ষমতা সীমাহীন নয়। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে থাকা চীনের ঋণ ২২ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার, যা তাদের জিডিপির ১০৪ শতাংশ। তৃতীয় স্থানে থাকা জাপানের ঋণ ৮ লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলার হলেও অর্থনীতির আকারের তুলনায় তাদের ঋণের অনুপাত সবচেয়ে বেশি, যা জিডিপির প্রায় ১৯৯ শতাংশ। যুক্তরাজ্য রয়েছে চতুর্থ স্থানে, যাদের ঋণ ৪ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার (জিডিপির ১০২ শতাংশ)।

বিশ্বে পঞ্চম শীর্ষ ঋণগ্রস্ত দেশ হলো ফ্রান্স। দেশটির মোট ঋণ ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি ডলার, যা তাদের জিডিপির ১১৮ দশমিক ৫ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্রান্সের সরকারি ঋণ দেশটির জিডিপির ১২১ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাবে, যা তাদের অর্থনীতিকে আরও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।

প্রতিরক্ষা বাজেটের চেয়েও বড় সুদের বোঝা
সরকার, পরিবার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধেই বৈশ্বিক ঋণ বেড়েছে আরও ১০ লাখ কোটি ডলার। ৩৬৫ লাখ কোটি ডলারের এই মোট ঋণকে ভাগ করলে বিশ্বের প্রতিটি মানুষের মাথাপিছু ঋণের দায় দাঁড়ায় প্রায় ৪৪ হাজার ডলার। এই বিশাল ঋণের সুদ দিতে গিয়েই সরকারগুলোর নাভিশ্বাস উঠছে। গত এক বছরে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো কেবল তাদের সরকারি বন্ডের সুদ বাবদ পরিশোধ করেছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি (৩.৩ ট্রিলিয়ন) ডলার। এই অঙ্কটি বিশ্বের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যয়ের (৩.১ ট্রিলিয়ন ডলার), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের সামগ্রিক বিনিয়োগের (২.৬ ট্রিলিয়ন ডলার) কিংবা পরিবেশবান্ধব জ্বালানি খাতের ব্যয়ের (২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার) চেয়েও অনেক বেশি।

সাধারণ মানুষের জীবনে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব কী?
সুদ পরিশোধের বোঝা যখন আকাশচুম্বী হয়, তখন সরকারগুলোর সামনে দুটি পথ খোলা থাকে—নাগরিকদের ওপর অতিরিক্ত কর চাপানো অথবা সরকারি সেবা খাতে ব্যয় কমানো। ইউরোপের দেশগুলোতে ঠিক এই পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে। পেনশনের বয়স বাড়ানো, স্বাস্থ্যসেবায় বরাদ্দ হ্রাস এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংস্কারে প্রয়োজনীয় তহবিল না পাওয়ার কারণেই ক্ষুব্ধ নাগরিকরা রাস্তায় নামছেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে সরকারি ঋণের খরচ বেড়ে যাওয়ার ফলে ব্যক্তিগত পর্যায়ে বাড়ি ও গাড়ির ঋণ এবং ক্রেডিট কার্ডের সুদের হারও চড়া হচ্ছে, যা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে তুলছে।

—আল জাজিরার প্রতিবেদনে অবলম্বনে

এএম