ইসরাইলের নির্বাচনে তুরুপের তাস মনসুর আব্বাস; নেতানিয়াহুকে হটাতে ইহুদি-আরব জোট

ইসলামপন্থি ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রাম দলের প্রধান মনসুর আব্বাস
ইসলামপন্থি ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রাম দলের প্রধান মনসুর আব্বাস | ছবি: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস
0

আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশটির প্রচারণা দেখলে মনে হতে পারে, দেশটির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি দন্তচিকিৎসক থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া মনসুর আব্বাস নামের এক ব্যক্তি।

বেশ কয়েক মাস ধরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর নির্বাচনি প্রচারণায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও মূল আকর্ষণে পরিণত হয়েছেন ইসলামপন্থি ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রাম দলের প্রধান মনসুর আব্বাস। নির্বাচনি বিজ্ঞাপনে ইহুদি ভোটারদের সতর্ক করে নেতানিয়াহু বলছেন, তিনি ক্ষমতাচ্যুত হলে পরবর্তী সরকারের আসল নিয়ন্ত্রক হবেন আব্বাস; যিনি ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ বিপদ এবং ডানপন্থিদের প্রধান ভয়ের কারণ একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের মূল রূপকার।

বাস্তবতা হলো, আব্বাসের অগ্রাধিকারের তালিকায় ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীর বা গাজা ইস্যুর চেয়ে ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ আরব নাগরিকের সংকটগুলোই প্রাধান্য পাচ্ছে। দেশটিতে আরব নাগরিকেরা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যমূলক আবাসন নীতি এবং চরম সহিংস অপরাধের শিকার।

নেতানিয়াহুর এ আক্রমণ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ইসরাইলের বহুদলীয় শাসনব্যবস্থায় সরকার গঠনের সমীকরণে আব্বাস আবারও তুরুপের তাস বা কিংমেকার হয়ে উঠতে পারেন। অতীতেও তিনি এ ভূমিকা পালন করেছিলেন। বিরোধী নেতারা যদি আব্বাসের সমর্থন না নেন, তবে নেতানিয়াহুকে হটিয়ে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন জোগাড় করা তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে।

এ পরিস্থিতি আব্বাসকে ইসরাইলের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী আরব নেতায় পরিণত করেছে। সামাজিকভাবে রক্ষণশীল দল রামের সঙ্গে মধ্যপন্থি ও উদার ইহুদি দলগুলোর এ ঐক্য ইসরাইলি রাজনীতির এক ব্যতিক্রমী সমীকরণ।

নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে এক সাক্ষাৎকারে আব্বাস জানান, চরমপন্থি সরকারকে পরাজিত করাই কেবল তার লক্ষ্য নয়; বরং আরব নাগরিকেরা যেন রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশীদার হতে পারেন, সেটাই তার উদ্দেশ্য। উত্তর ইসরাইলের তুবা-জাঙ্গারিয়া শহরে এক নির্বাচনি সমাবেশে তিনি সমর্থকদের বলেন, ‘আমরা আর ক্ষমতাশালীদের টেবিলে এতিম হয়ে বসে থাকব না।’

নেতানিয়াহুকে ঠেকাতে আব্বাস এবার সবচেয়ে সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি রামের নির্বাচনি তালিকায় দুই নম্বর প্রার্থী হিসেবে যুক্ত করেছেন সাবেক শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা ও মধ্য-বামপন্থি রাজনীতিক ইয়োআভ সেগালোভিৎজকে। ইসরাইলের ইতিহাসে মূলধারার কোনো আরব দলের ব্যানারে একজন জায়নবাদী ইহুদি রাজনীতিবিদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘটনা এটিই প্রথম। নাজারেথে সেগালোভিৎজকে পাশে নিয়ে হিব্রু ভাষায় আব্বাস বলেন, ‘পরিবর্তন আনতে হলে অপরজনকে শত্রু হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে দেখতে হবে।’

উত্তর ইসরাইলের গ্যালিলি অঞ্চলের মাগার শহরে জন্ম নেয়া আব্বাস পেশায় একজন দন্তচিকিৎসক এবং একটি মসজিদের ইমাম। স্থানীয় বিভিন্ন বিরোধে মধ্যস্থতার মাধ্যমে পরিচিতি পাওয়ার পর ২০১৯ সালে নেসেটের (পার্লামেন্ট) সদস্য নির্বাচিত হন। এর আগে ২০২১ সালে তিনি নেতানিয়াহুর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে প্রকাশ্যে আসেন এবং পরে বিরোধীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নাফতালি বেনেটের সরকার গঠন করে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ভূমিকা রাখেন।

২০২২ সালে নেতানিয়াহু কট্টর ডানপন্থিদের সঙ্গে জোট গড়ে ক্ষমতায় ফেরেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর ইসরাইলি ইহুদিদের মধ্যে আরবদের প্রতি অবিশ্বাস বাড়ে। আব্বাস শুরু থেকেই ৭ অক্টোবরের হামলার তীব্র নিন্দা জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন এবং হামাসের সহিংসতার সমালোচনা করেন।

তবে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তিনি চতুর্মুখী চাপে রয়েছেন। নেতানিয়াহু ও তার মিত্ররা তাকে চরমপন্থি হিসেবে তুলে ধরছেন। অন্যদিকে ইহুদি বিরোধী নেতারা ডানপন্থি ভোটারদের হারানোর ভয়ে তার কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন। আবার অন্য আরব দলগুলো ফিলিস্তিন ইস্যুতে আপস করার অভিযোগে আব্বাসের কঠোর সমালোচনা করছে।

আব্বাস ও সেগালোভিৎজের এ জোটের সামনে অভ্যন্তরীণ অনেক বৈপরীত্যও রয়েছে। সেগালোভিৎজ আরবি জানেন না, তিনি ধর্মনিরপেক্ষ এবং সমকামী অধিকারের পক্ষে; অন্যদিকে আব্বাস ধর্মীয়ভাবে সমকামী অধিকারের ঘোর বিরোধী। তবে অপরাধ দমন এবং আরবদের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তারা একমত হয়েছেন।

সেগালোভিৎজের তত্ত্বাবধানে অতীতে আরব অঞ্চলে অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল। তবে নেতানিয়াহু পুনরায় ক্ষমতায় এসে উগ্র ডানপন্থি নেতা ইতামার বেন-গভিরকে পুলিশের দায়িত্ব দেয়ার পর আরব এলাকাগুলোতে হত্যাকাণ্ড ও অপরাধ নজিরবিহীন হারে বেড়ে যায়।

এক সাক্ষাৎকারে সেগালোভিৎজ বলেন, ‘আমি মনসুরকে বিশ্বাস করি। তিনি একজন সাহসী মানুষ এবং নিজের সাহসের মূল্য দিচ্ছেন। আমার কাছে তিনি ইসরাইলের ভবিষ্যতের একটি আশা।’ এ আশার বাস্তবতা কতটা শক্ত, তা জানা যাবে আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনেই।

এএম