ধ্রুপদি সাহিত্যের সঙ্গে আধুনিক মনস্তত্ত্বের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন অ্যান কারসন

অ্যান কারসন
অ্যান কারসন | ছবি: সংগৃহীত
0

ধ্রুপদি সাহিত্যের সঙ্গে আধুনিক মনস্তত্ত্বের মেলবন্ধন ঘটিয়ে ২০২৬ সালের সাহিত্যে মর্যাদাপূর্ণ নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন কানাডার কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও ক্লাসিকস গবেষক অ্যান কারসন। সুইডিশ একাডেমি তার সাহিত্যকর্মকে মূল্যায়ন করে জানিয়েছে, ‘সাহসী ও উদ্ভাবনী সৃষ্টিকর্মের জন্য, যা ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে ক্রীড়াময় সংলাপের মাধ্যমে সমকালীন সাহিত্যের নতুন রূপ তৈরি করেছে’ তাকে এই সম্মাননায় ভূষিত করা হল।

সাহিত্যের প্রথাগত সীমানা ভাঙার কারিগর
অ্যান কারসন ১৯৫০ সালের ২১ জুন কানাডার টরন্টোতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মূলত কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তার কাজের পরিধি গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ, অনুবাদ ও অধ্যাপনা পর্যন্ত বিস্তৃত। কারসনের প্রধান লেখার ভাষা ইংরেজি। তিনি দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য ও সংস্কৃতির অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

কবিতা, গদ্য, অনুবাদ, নাট্যরূপ, জীবনী ও কল্পকাহিনির প্রথাগত সীমারেখা ভেঙে সম্পূর্ণ নিজস্ব এক সাহিত্যশৈলী তৈরি করেছেন তিনি। প্রাচীন গ্রিক পুরাণ, দর্শন ও ট্র্যাজেডির প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সমকালীন মানুষের প্রেম, একাকিত্ব, ক্ষতি, মানসিক ক্ষত ও আত্মপরিচয়ের সংকটকে তিনি একসূত্রে গেঁথেছেন।

পৌরাণিক বেদনা ও সমকালীন সংকট
কারসনের রচনায় প্রাচীন পুরাণ বা মিথ কোনো নিছক অতীত ইতিহাস হয়ে থাকে না। তিনি পৌরাণিক চরিত্রগুলোকে আধুনিক মনস্তত্ত্ব ও মানবিক অভিজ্ঞতার আলোকে পুনর্নির্মাণ করেন। ফলে হাজার বছরের পুরোনো কোনো বেদনা তার লেখনীতে বর্তমান সময়ের মানুষের ব্যক্তিগত সংকটের মতো বাস্তব হয়ে ওঠে। কানাডিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (সিবিসি) তার কাজকে এমন সাহিত্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যেখানে প্রাচীন পুরাণের সঙ্গে আধুনিক মানুষের নিঃসঙ্গতা ও বিচ্ছিন্নতাবোধের সংযোগ ঘটানো হয়।

উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
কারসনের সর্বাধিক আলোচিত বইগুলোর একটি অটোবায়োগ্রাফি অব রেড। এটি গ্রিক পুরাণের ডানাওয়ালা দানব গেরিয়ন চরিত্রকে আধুনিক এক তরুণের রূপ দিয়ে রচিত একটি পদ্য-উপন্যাস (ভার্স নভেল)। এতে প্রেম, অপমান ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্নগুলো গভীর দার্শনিক দৃষ্টিতে তুলে ধরা হয়েছে। পরবর্তীতে তিনি এ ধারার রেড ডক শীর্ষক আরেকটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন।

আরও পড়ুন:

২০০১ সালে প্রকাশিত তার দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড বইটি দাম্পত্য সম্পর্কের জটিলতা ও বিচ্ছেদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে রচিত। এই বইটির জন্য তিনি ইংল্যান্ডের বিখ্যাত টি এস এলিয়ট প্রাইজ লাভ করেন এবং তিনিই ছিলেন এই পুরস্কার পাওয়া প্রথম নারী। এ ছাড়া মেন ইন দ্য অফ আওয়ার্স কাব্যগ্রন্থের জন্য ২০০১ সালে তিনি কানাডার প্রথম গ্রিফিন পোয়েট্রি প্রাইজ অর্জন করেন। সোফোক্লিসের বিখ্যাত ট্র্যাজেডি নিয়ে তার রচিত অ্যান্টিগোনিক নাটকীয় পুনর্নির্মাণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

অনুবাদকে পুনর্লিখনে রূপান্তর
ক্লাসিকস গবেষক হিসেবে প্রাচীন গ্রিক নাটক ও কবিতার ওপর কারসনের পাণ্ডিত্য বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। তার অনূদিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ইলেক্ট্রা, স্যাফোর কবিতার খণ্ডাংশ নিয়ে রচিত ইফ নট, উইন্টার: ফ্র্যাগমেন্টস অব স্যাফো এবং অ্যান ওরেস্তেইয়া। কারসন কেবল আক্ষরিক অনুবাদ করেননি; বরং প্রাচীন চরিত্রের প্রেম, ক্ষোভ ও নৈতিক দ্বন্দ্বকে বর্তমান পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

নোবেল পাওয়ার আগে থেকেই অ্যান কারসন বিশ্বসাহিত্যে ব্যাপকভাবে সমাদৃত ছিলেন। তিনি ম্যাকআর্থার ফেলোশিপ (যা জিনিয়াস গ্রান্ট নামে পরিচিত), গুগেনহাইম ফেলোশিপ ও পুশকার্ট প্রাইজসহ একাধিক মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি লাভ করেছেন। ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কারের পুরো ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা অর্থমূল্য পাচ্ছেন তিনি।


তথ্য সূত্র : নোবেল প্রাইস ওয়েবসাইট; ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস; স্নোপস; ম্যাকটিউটর হিস্ট্রি অব ম্যাথমেটিকস আর্কাইভ; আইএফএলসায়েন্স; ফিল্ডস মেডেল ও আবেল পুরস্কারের অফিসিয়াল

এএম