গত ৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার ঘটনা এটি। ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের ছোট্ট শহর আল-খোখা। এর এক সপ্তাহ আগে ইরান-সমর্থিত হুথিরা হোদেইদাহ ও তায়েজ প্রদেশে সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে তাদের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযানগুলোর একটি শুরু করেছিল। সেদিন সরকারি বাহিনী মোখা শহর থেকে পিছু হটলে হুথিরা উপকূলীয় শহরটি ও আল-খোখা দখল করে নেয়। পরদিন তারা বাব-এল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণও নিয়ে নেয়।
সাঈদ বুঝতে পারলেন, এক মুহূর্তও দেরি করা যাবে না। কিন্তু প্রথমে ভাই মোহাম্মদকে রাজি করাতে হলো। ৪৭ বছর বয়সি মোহাম্মদ বললেন, ‘ছেলেরা যখন বাইরে গিয়ে সেনাদের চলে যাওয়ার ভিডিও করে দেখালো, তখনই কেবল বিশ্বাস করলাম।’
এর মধ্যেই কাছে একটি বাস্তুচ্যুত মানুষদের একটি শিবিরে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। মোহাম্মদের ছেলে শাকের দেখতে গিয়ে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যায়। সেখানে সে একজন আহত মানুষকে দেখে, যার পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
দুই ভাইয়ের পরিবার এর আগেও একবার বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। ২০১৮ সালে হোদেইদাহর গ্রাম থেকে পালিয়ে তারা আল-খোখায় আশ্রয় নিয়েছিল। এবার আবার সেই একই পরিস্থিতি। সাঈদ বললেন, ‘যা হাতে বহন করতে পারি, শুধু তা-ই নিয়েছি।’ মোহাম্মদ ও তার স্ত্রী ফাতিমা কাপড়ের ব্যবসা করতেন। ঘরে পাহাড় সমান পণ্য ছিল। কিন্তু সেসব ফেলে শুধু কাগজপত্র, কিছু জামাকাপড় ও হালকা জিনিস নিয়ে রাত সাড়ে ৯টায় রওনা দিলেন তারা।
ভেবেছিলেন, মোখায় রাত কাটিয়ে পরদিন ফিরে বাকি জিনিস নিয়ে আসবেন। কিন্তু হুথিদের অগ্রগতি এত দ্রুত ছিল যে সে সুযোগ আর মেলেনি। পিছনে ফেলে আসা টিন ও ত্রিপল দিয়ে তৈরি ঘর স্থানীয় লোকজন ভেঙে নিয়ে গেছে।
রাস্তায় সাঈদ দেখলেন, সৈন্যরা অস্ত্র ফেলে পালাচ্ছে। তিনি বললেন, ‘একটি নতুন কামান পড়ে থাকতে দেখলাম, যেটি থেকে একটি গুলিও ছোড়া হয়নি।’ বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির মধ্যে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় মোহাম্মদের ট্রাকের টায়ার ফেটে গেলো। গাড়ি উল্টে যাওয়ার উপক্রম হলো। তিনি একটি জীর্ণ টায়ার লাগিয়ে কোনোমতে চলতে থাকলেন।’
তিনি বলেন, ‘পানি ছিলো না, দোকানপাট বন্ধ। খাবারও নেই। মোহাম্মদের স্ত্রী ফাতিমা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে পথচারীদের কাছে পানি চাইলেন। শুধু একজন বড় পরিবার নিয়ে যাওয়া ব্যক্তি গাড়ি থামিয়ে তার কিছুটা পানি ঢেলে দিলেন।
মোখা শহরে পৌঁছে সাঈদ দেখলেন, শহর জনশূন্য। সেনাবাহিনীর গাড়িগুলো মোখা এড়িয়ে সরাসরি এডেনের দিকে ছুটছে। তিনিও তাদের অনুসরণ করলেন। রাস্তায় হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় নিহত সৈন্যদের মরদেহ পড়ে ছিল। মোহাম্মদ বললেন, ‘আমার স্ত্রী একজন মানুষের শরীরের উপরের অংশ দেখে কেঁদে ফেললেন। আমরা দেখলাম, সৈন্যরা ইউনিফর্ম খুলে ফেলছে, অস্ত্র বালিতে পুঁতে ফেলছে—হুথিদের হাতে ধরা পড়ার ভয়ে।’
এডেনের কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে মোহাম্মদের ট্রাকের সেই জীর্ণ টায়ারটিও ফেটে গেল। ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত, সারারাত জেগে থাকা মোহাম্মদ টায়ারটি কাঁধে নিয়ে মেরামতের দোকান খুঁজতে লাগলেন। কেউ তাকে লিফট দিল না। প্রায় ছয় ঘণ্টা পর তিনি পরিবারের কাছে ফিরলেন।
এডেনে একটি স্কুলে আশ্রয় মিলল। একটি কক্ষে আটটি পরিবার। সাঈদ বললেন, ‘বলা হলো, শুধু নারীরা কক্ষে থাকতে পারবেন। তাই আমি পরিবারকে ভেতরে রেখে বাইরে খোলা আকাশের নিচে ঘুমিয়েছি।’
এক সপ্তাহ পর, ১৬ সেপ্টেম্বর, প্রায় ৩০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তারা মুকাল্লা শহরে পৌঁছালেন। দুই ভাই এখন মাসে ৪০০ সৌদি রিয়াল (প্রায় ১০৭ ডলার) ভাড়ায় একটি তিন কক্ষের ফ্ল্যাটে থাকেন। দুই সপ্তাহ ধরে কোনো কাজ পাননি। সঞ্চয় ফুরিয়ে আসছে। মোহাম্মদ বললেন, ‘আজও সকালের নাস্তা হয়নি। টাকা বাঁচাতে খাবার বাদ দিই। আমি দিনমজুর, যেকোনো কাজ করতে পারি—মৌমাছি পালন, গাছে ওঠা, পাথর বহন।’
তবে ফাতিমার সবচেয়ে বড় চিন্তা খাবার বা বাসস্থান নয়। তার চিন্তা ১ কোটি ২০ লাখ রিয়াল (প্রায় ৮ হাজার ডলার) ঋণ, যা কাপড়ের ব্যবসায়ীদের কাছে বাকি ছিল। সব হারিয়ে এখন সেই ঋণ শোধ করার কোনো উপায় নেই। তিনি বললেন, ‘মসজিদে গিয়ে প্রার্থনা করি, আল্লাহ যেন সাহায্য করেন। ঋণ শোধ করার আগে মরতে চাই না।’
ইয়েমেন সরকারের বাস্তুচ্যুত ব্যবস্থাপনা ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে প্রায় ১ লাখ ৯৮ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। মুকাল্লায় পৌঁছানো মানুষদের মধ্যে বৃদ্ধ, অসুস্থ, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীরা রয়েছেন, যাদের কাছে নিজেদের জামাকাপড় ছাড়া আর কিছুই নেই।
—আল জাজিরার প্রতিবেদনে অবলম্বনে





