চীন-জাপান উত্তেজনা: ৮১ বছরের পুরোনো রুশ সিনেমা নিয়ে কেন চিন্তিত তাইওয়ান

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পূর্ব এশিয়ায় রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে প্রদর্শনী
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পূর্ব এশিয়ায় রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে প্রদর্শনী | ছবি: রয়টার্স
0

তাইওয়ানের রাজধানী তাইপের একটি ভবনের ছোট্ট কক্ষে দর্শক ছিলেন মাত্র ২০ জন। সেখানে দেখানো হয়েছে ৮১ বছরের পুরোনো সোভিয়েত আমলের একটি সাদাকালো তথ্যচিত্র। এমন ছোট আয়োজনই উদ্বেগ তৈরি করেছে তাইওয়ান সরকারের মধ্যে। তাদের আশঙ্কা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের ভূমিকা সামনে এনে তাইওয়ান ও জাপানের সম্পর্কে বিভাজন তৈরির চীন-রাশিয়ার প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে এ প্রদর্শনী। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, তাইপেতে রাশিয়ার কার্যত দূতাবাস হিসেবে কাজ করা মস্কো-তাইপে কো-অর্ডিনেশন কমিশন অন ইকোনমিক অ্যান্ড কালচারাল কো-অপারেশন গত সপ্তাহে আমন্ত্রণের ভিত্তিতে সিনেমাটি প্রদর্শন করে। অতিথিদের মধ্যে ছিলেন সাবেক সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও শিক্ষাবিদেরা।

১৯৪৫ সালে নির্মিত তথ্যচিত্রটির মূল নাম দ্য ডিফিট অব মিলিটারিস্ট জাপান। এতে জাপান-অধিকৃত মাঞ্চুরিয়া ও কুরিল দ্বীপপুঞ্জে সোভিয়েত বাহিনীর অভিযানের দৃশ্য এবং চীনা বেসামরিক মানুষের ওপর জাপানি বাহিনীর নৃশংসতার ফুটেজ রয়েছে।

রুশ দপ্তরটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিনেমাটির নাম চীনা ভাষায় এমনভাবে অনুবাদ করেছে, যার অর্থ দাঁড়ায় ‘সামরিকবাদী জাপানকে চূর্ণ করা’। তাইওয়ানের কর্মকর্তাদের উদ্বেগের একটি কারণ এটিই।

জাপানকে নিয়ে এখন কেন এত স্পর্শকাতরতা

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি গত বছর বলেছিলেন, তাইওয়ানে চীনের সম্ভাব্য সামরিক হামলা জাপানের সামরিক প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে। এ বক্তব্যের পর বেইজিং ও টোকিওর মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

চীন এরপর থেকে জাপানের বিরুদ্ধে অতীতের সামরিক আগ্রাসনের পথে ফিরে যাওয়ার অভিযোগ তুলে আসছে। তাইওয়ানের কর্মকর্তাদের ধারণা, রাশিয়ার এই চলচ্চিত্র প্রদর্শনী সেই বক্তব্যকেই আরও ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা।

তাইওয়ানের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল রয়টার্সকে জানিয়েছে, চীন ও রাশিয়ার সামরিক সহযোগিতার পাশাপাশি তাদের ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের’ তৎপরতাও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সংস্থাটি অভিযোগ করেছে, দুই দেশ নির্দিষ্ট কিছু বিষয়কে সামনে এনে ঐতিহাসিক ঘটনা ও রাজনৈতিক ইস্যুর ব্যাখ্যা নিজেদের পক্ষে নেয়ার চেষ্টা করছে।

চীন অবশ্য তাইওয়ানের উদ্বেগকে প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির তাইওয়ানবিষয়ক দপ্তর একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে চীনবিরোধী মনোভাব তৈরির আরেকটি কৌশল বলে মন্তব্য করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সিনেমা প্রদর্শনের বিষয়ে তারা অবগত নয়। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসের ‘সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি’ সংরক্ষণ করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেছে তারা।

রাশিয়াকে ঘিরে আলাদা উদ্বেগ কেন

তাইওয়ানে বিদেশি প্রভাব ঠেকাতে ২০১৯ সাল থেকে অনুপ্রবেশবিরোধী আইন রয়েছে। এর প্রধান লক্ষ্য চীনের গোপন রাজনৈতিক প্রভাব ঠেকানো। তাইওয়ানের কর্মকর্তাদের মতে, রাশিয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টি তুলনামূলক জটিল। চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে যে মাত্রার আইনি নজরদারি থাকে, রুশ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সব সময় তা প্রযোজ্য নাও হতে পারে।

তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৈধ সাংস্কৃতিক ও সামাজিক যোগাযোগের অধিকার তারা স্বীকার করে। একই সঙ্গে রাশিয়ার দপ্তরের কার্যক্রমে ঐতিহাসিক সত্য এবং গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার মতো মূল্যবোধের প্রতি সম্মান থাকা উচিত।

প্রদর্শনীতে রয়টার্সের সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। রুশ দপ্তর জানায়, এটি শুধু আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত এক ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রদর্শনী শেষে রুশ প্রতিনিধি পাভেল লাপিন ভবিষ্যতে এমন আরও অনুষ্ঠান আয়োজনের আগ্রহ প্রকাশ করেন।

বড় ভূরাজনীতির সঙ্গে যোগসূত্র

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে মস্কোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞায় যোগ দেয় তাইওয়ান। এরপর তাইওয়ানকে ‘অবন্ধুসুলভ’ দেশ ও অঞ্চলের তালিকায় রেখেছে রাশিয়া। মস্কোর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও তাইওয়ানের ওপর চীনের সার্বভৌমত্বের দাবির প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন।

অন্যদিকে জাপানের সঙ্গেও কুরিল দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে রাশিয়ার কয়েক দশকের বিরোধ রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে জাপানের উত্তরের চারটি দ্বীপ নিয়ন্ত্রণে নেয় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। গত মাসে ওই দ্বীপগুলোর একটিতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সফর করলে প্রতিবাদ জানায় টোকিও।

গত আগস্টে চীন ও রাশিয়া যৌথ বিবৃতিতে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পুনরায় সামরিকীকরণের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তাও দিয়েছিল।

ফলে তাইপের ছোট একটি কক্ষে মাত্র ২০ দর্শকের সামনে পুরোনো একটি সিনেমা দেখানোর ঘটনাকে শুধু সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে দেখছে না তাইওয়ান। তাদের আশঙ্কা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি ও বর্তমান চীন-জাপান উত্তেজনাকে কাজে লাগিয়ে তাইওয়ানের জনমত ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করার বড় প্রচেষ্টার ছোট অংশ হতে পারে এটি।

এএম