ডিজেল-সারের দাম বাড়তি: ৪০ বছরের সবচেয়ে বড় সংকটে মার্কিন কৃষকেরা

যুক্তরাষ্ট্রে খরায় শুকিয়ে যাওয়া ভুট্টাক্ষেতে হাঁটছেন এক কাউন্টি শেরিফ
যুক্তরাষ্ট্রে খরায় শুকিয়ে যাওয়া ভুট্টাক্ষেতে হাঁটছেন এক কাউন্টি শেরিফ | ছবি: সংগৃহীত
0

যুক্তরাষ্ট্রের কর্ন বেল্ট অঞ্চলের শস্যচাষিরা বলছেন, ডিজেল ও সারের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় তারা ৪০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান যুদ্ধের জেরে জ্বালানি ও কৃষি উপকরণের খরচ বেড়েছে বলে তারা অভিযোগ করছেন। এতে ভুট্টা ও সয়াবিন উৎপাদনকারীদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে, যার প্রভাব পড়তে পারে খাদ্যপণ্যের দামেও।

নেব্রাস্কার পূর্বাঞ্চলে ভুট্টা ও সয়াবিন চাষ করেন ম্যাট বেইলি। তিনি বলেন, ‘উপকরণের দাম পুরোপুরি তালগোল পাকিয়ে গেছে।’ তার হিসাবে, বীজ বপনের সময় ব্যবহৃত ফসফরাসসমৃদ্ধ সার ১১-৫২-০–এর দাম ১০ বছর আগে প্রতি টন ৪৭০ ডলার ছিল, এখন তা ৯০০ ডলারের ওপরে। বেইলি বলেন, ‘এটা দিয়ে বাজেট করবেন কীভাবে?’

প্রতিবেদনে বলা হয়, ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে জ্বালানি ও ফসলের পুষ্টি উপকরণের দামে বড় উল্লম্ফন দেখা যায়। অথচ শস্যের দাম কম থাকা এবং আয় কমে যাওয়ার কারণে এমনিতেই কয়েক বছর ধরে চাপে ছিলেন কৃষকেরা। অনেকে বলছেন, ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধও তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, বিশেষ করে চীনে যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিন রপ্তানি কমে যাওয়ায়।

নেব্রাস্কা ফার্মার্স ইউনিয়নের সভাপতি জন হ্যানসেন বলেন, ‘১৯৮০–এর দশকের পর এটিই খাতটির সবচেয়ে খারাপ আর্থিক মন্দা।’

ডিজেল-সার খরচ কোথায় গিয়ে দাঁড়ালো

যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, কৃষিযন্ত্র চালাতে বহুল ব্যবহৃত ডিজেলের গড় দাম দেশজুড়ে গ্যালনপ্রতি বেড়ে ৫ দশমিক ৪৫ ডলারে উঠেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে তা ছিল ৩ দশমিক ৮১ ডলার।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বড়ভাবে কমে যাওয়ায় জ্বালানির দামে চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সারের বৈশ্বিক সরবরাহও বিঘ্নিত হয়েছে। এর আগে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর সারবাজারে বড় ধাক্কা লেগেছিল; নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে সেই চাপ বাড়ছে।

নর্দার্ন আইওয়ার কৃষক এবং ন্যাশনাল কর্ন গ্রোয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি প্যাম জনসন বলেন, ‘ইরান যুদ্ধ আমাদের মতো কৃষকদের জন্য এত অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।’ তার ভাষ্য অনুসারে, পরবর্তী দুই বছর কৃষকেরা কোনো লাভ করতে পারবেন না—এমন পূর্বাভাসই বেশি শোনা যাচ্ছে।

লোকসানের হিসাব: ফার্ম ব্যুরোর গবেষণা

আমেরিকান ফার্ম ব্যুরো ফেডারেশনের (এএফবিএফ) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সরকারি সহায়তা না থাকলে ভুট্টাসহ ৯টি প্রধান ফসলে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকেরা এ বছর ৩১ বিলিয়ন ডলার লোকসানে পড়তে পারেন এবং ২০২৭ সালে লোকসান হতে পারে ৩২ বিলিয়ন ডলার।

এএফবিএফের অর্থনীতিবিদ ফেইথ পারুম বলেন, ‘ভুট্টা উৎপাদনে চলতি বছর একরপ্রতি লোকসান ধরা হচ্ছে ১৩১ ডলার, যা ২০২৭ সালে বেড়ে ১৬৭ ডলারে যেতে পারে। সয়াবিনে চলতি বছর একরপ্রতি লোকসান ৮০ ডলার; আগামী বছর তা ১৩৮ ডলারে উঠতে পারে। তার মতে, ২০২৭ সাল হলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম সারির বেশির ভাগ ফসলের ক্ষেত্রে টানা ষষ্ঠ বছর নেতিবাচক রিটার্ন দেখা যেতে পারে।

আবহাওয়া চাপ বাড়াচ্ছে

খরচ বৃদ্ধির সঙ্গে খরা ও গরম-শুষ্ক আবহাওয়া কৃষকদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। নেব্রাস্কার মিডো গ্রোভের কাছে ভুট্টা ও সয়াবিন চাষ করেন জন ডিটরিখ। তিনি বলেন, ‘আমাদের খরা আরও খারাপ হচ্ছে, ভারী বৃষ্টির ঘটনাও আরও খারাপ হচ্ছে, বাতাসও আরও ভয়াবহ।’ তার ভাষ্য অনুসারে, ৪৪ বছরের কৃষিজীবনে আবহাওয়া ও ব্যয়ের কারণে ঝুঁকি এখন ‘যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি’।

নেব্রাস্কায় জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে ১১ দশমিক ৮৬ ইঞ্চি, যা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩ দশমিক ১ ইঞ্চি কম। ১৮৯৫ সালের পর রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর জানুয়ারি-জুলাই সময়ে এটি নেব্রাস্কার ১৮তম সবচেয়ে শুষ্ক সময় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

খাদ্যদামে প্রভাবের আশঙ্কা

খরার কারণে বাজারে ভুট্টার দামও বাড়ছে। ডিসেম্বরে সরবরাহের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ভুট্টার দাম চলতি মাসে ১০ শতাংশ বেড়ে বুশেলপ্রতি ৫ দশমিক ১৫ ডলারে উঠেছে; ২০২৩ সালের পর এটিই সর্বোচ্চ। সয়াবিন ও গমসহ অন্যান্য পণ্যের দামও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ঊর্ধ্বমুখী। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে।

ফুড ইনস্টিটিউট নামের গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী ব্রায়ান চোই বলেন, ‘এতে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়বেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভুট্টার দাম এ বছর প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে, শেষ পর্যন্ত সেটা ভোক্তার কাছেই গিয়ে পড়বে।’

নির্বাচন সামনে চাপ বাড়ছে

প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব শহরের কর্মজীবী পরিবার থেকে শুরু করে গ্রামীণ কৃষিপ্রধান এলাকাগুলো পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। এক জরিপে ৫৩ শতাংশের বেশি নিবন্ধিত ভোটার বলেছেন, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফেরার পর তাদের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়েছে। নভেম্বরে কংগ্রেস নির্বাচনের আগে এ চিত্র রিপাবলিকানদের জন্য চাপ বাড়াতে পারে।

রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস সোমবার বলেন, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত আমাদের হাতে ৭১ দিন আছে, আর এই মুহূর্তে গ্রামীণ কৃষিপ্রধান এলাকাকে শোনানোর মতো কোনো ইতিবাচক বার্তা আমাদের নেই। গত বছরের লিবারেশন ডে থেকে আমাদের ছিলও না।’

ট্রাম্প জুনে কৃষকদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আমরা কখনো আপনাদের হতাশ করব না।’ একই মাসে তার প্রশাসন ১১ বিলিয়ন ডলারের একটি অর্থায়ন প্যাকেজ চায়, যাতে শস্য ও বিশেষায়িত ফসল উৎপাদনকারীরা জরুরি সহায়তা পাবেন। তবে কৃষি সংগঠনগুলোর মতে, তা যথেষ্ট নয়।

এছাড়া খাদ্য দাম সামাল দিতে ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু উদ্যোগ কৃষি খাতেও আপত্তি তৈরি করেছে। গত সপ্তাহে গবাদিপশু খামারিদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়, যখন ট্রাম্প ৯০ দিনের জন্য সর্বোচ্চ ৩ লাখ টন গরুর মাংস আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা দেন। কিছু খামারি একে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে মন্তব্য করেন।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমস

এএম