অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ
গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে স্কট বেসেন্ট এই নিষেধাজ্ঞাকে ইরানের অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে আমাদের লক্ষ্য হলো এই স্বৈরাচারী শাসনকে টিকিয়ে রাখা প্রতিটি অর্থনৈতিক জীবনরেখা ছিন্ন করা, যতক্ষণ না তেহরান সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়ে।’
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ জানিয়েছে, নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় এমন নেটওয়ার্কগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যেগুলো ইরানকে তেল রাজস্ব আয়, অস্ত্র সংগ্রহ ও সাইবার তৎপরতা চালাতে সহায়তা করছে বলে ওয়াশিংটনের অভিযোগ। নিষেধাজ্ঞার এই অভিযান ইরানের অর্থনীতির পাঁচটি খাতকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, স্বর্ণ, বিমান চলাচল ও জাহাজ শিল্প।
কারা নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছেন
মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীন, সিঙ্গাপুর ও ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত এই নিষেধাজ্ঞা তালিকায় ১২টি দেশের প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিরা রয়েছেন।
ইরান: তালিকার শীর্ষে রয়েছে ইরানের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় (এমওআইএস) এবং প্রতিরক্ষা ও সশস্ত্র বাহিনী লজিস্টিকস মন্ত্রণালয় (এমওডিএএফএল)। এছাড়া ইরানভিত্তিক লজিস্টিক কোম্পানি নোয়াভারান অ্যাক্সিস প্রাইভেট জয়েন্ট স্টক কোম্পানি (বিআরই লাইন) এবং এমওআইএস-সংশ্লিষ্ট সাইবার তৎপরতায় জড়িত বলে অভিযুক্ত মোহাম্মদ হোসেইন আসলানি, রেজা কাদখোদাই ও আরমান কাহজাদিয়ানের নামও তালিকায় রয়েছে।
হংকং: সুইট ওশান ইন্ডাস্ট্রিয়াল লিমিটেডসহ প্রায় এক ডজন হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছে। মার্কিন ট্রেজারির অভিযোগ, সুইট ওশান ইরানের মালেক আশতার ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির জন্য সংবেদনশীল সরঞ্জামের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছিল। ফেইলি কো, মিনভুর, ফেইসু ও গুসকা কো-সহ বেশ কয়েকটি কোম্পানিকেও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ইরানের ছায়া ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের অর্থ লেনদেনে সহায়তার অভিযোগে তিনটি কোম্পানি এবং ইরানি তেল বহনকারী জাহাজগুলোর জ্বালানি সেবা সমন্বয়ের অভিযোগে শিপঅয়েল লিমিটেডও তালিকায় রয়েছে।
চীন: শেনঝেন সুইট ওশান টেকনোলজি লিমিটেড এই ক্রয় নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে রয়েছে। পরীক্ষামূলক যন্ত্রপাতি, ল্যাব ডিভাইস ও ইলেকট্রনিক পণ্য সরবরাহকারী এই প্রতিষ্ঠানটি ইরানি গ্রাহকদের জন্য ক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এর পরিচালক তিয়ান জিয়ানবাইকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়া শেনঝেন হুয়ামেই লিয়ানইউন ইন্টারন্যাশনাল লজিস্টিকস, শেনঝেন বোসিতং লজিস্টিকস ও লিলিমুন নেভিগেশন ইনকর্পোরেটেডকেও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
সিঙ্গাপুর: আজুর শিপিং প্রাইভেট লিমিটেডকে ন্যাশনাল ইরানিয়ান ট্যাংকার কোম্পানির সঙ্গে কাজ করার জন্য এবং ওয়েলব্রেড ক্যাপিটাল প্রাইভেট লিমিটেডকে ইরানি তেল ব্যবসায়ী শামখানির পক্ষে কাজ করার অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে।
অন্যান্য দেশ: মালয়েশিয়ার ভাস্ট মার্ট, যুক্তরাজ্যের এস্টানিকা ট্রেডিং, ফ্রান্সের লা নিভেরনেজ দ্য রাফিনাজ, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের সিফরা শিপিং এবং গ্রিসের দুই নাগরিক আলম্পের্তোস সোরিস ও গিওর্গিওস সোরিসও তালিকায় রয়েছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক সিরীয় নাগরিক মোহাম্মদ আহমেদ সুহিল ফাত্তুহ ও ইউক্রেনীয় নাগরিক ইভান ওবুখভকে ইরানি ছায়া নৌবহরের দালাল হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
চীনকে কেন ছাড় দেয়া হলো
নিষেধাজ্ঞা তালিকায় চীনা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুপস্থিতি লক্ষণীয়। চীন কয়েক বছর ধরে ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। স্কট বেসেন্ট ভবিষ্যতে কোন দেশগুলো সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে, তা নির্দিষ্ট করে বলেননি। তিনি বলেন, ‘আমি কেন বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা ধ্বংস করতে চাইব?’
বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন বেইজিংয়ের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ এড়াতে চাইছে, বিশেষ করে চীন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের প্রধান সরবরাহকারী হওয়ায়।
ইরানের প্রতিক্রিয়া
ইরান এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরানের অর্থমন্ত্রী আলী মাদানিজাদেহ বলেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নতুন কিছু নয়। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় আমাদের কর্মসূচি রয়েছে এবং আমাদের অর্থনীতির ধমনী কেটে ওয়াশিংটন তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না।’
ইরানের সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি এক্স প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, ‘সরকার ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তার সঙ্গে দেশকে এই পর্যায়েও পরিচালনা করবেন। আমরা অর্থনৈতিক কষ্ট অস্বীকার করি না, তবে সঠিক বিচারবুদ্ধি ও ঐক্য বজায় রেখে অতীতের মতো এই কঠিন পরীক্ষাও আমরা উত্তীর্ণ হব।’
আইআরজিসির মুখপাত্র সর্দার মোহেব্বি বলেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধে নামাই প্রমাণ করে যে যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র পরাজিত হয়েছে।’
তেহরানের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক আলী আকবর দারেইনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘ইরানের নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর ক্ষেত্রে পিএইচডি ডিগ্রি আছে। তাই ইরান সম্পূর্ণ নিশ্চিত যে তারা বিজয়ী হবে এবং ইরানকে শ্বাসরোধ করার মার্কিন প্রচেষ্টা আবারও ব্যর্থ হবে।’
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
চীন জানিয়েছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সংঘাত সমাধান করবে না। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, ‘চীন ও ইরানের মধ্যে সহযোগিতা সব সময় আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়েছে এবং এতে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘চীন অবৈধ একতরফা নিষেধাজ্ঞার দৃঢ় বিরোধিতা করে এবং নিজের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় সব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।’
জাতিসংঘের সাবেক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার ও মার্কিন আইনজীবী আলফ্রেড-মরিস দ্য জায়াস সতর্ক করে বলেন, ‘ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ বুুমেরাং হয়ে ফিরে আসতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প ইরানের ওপর অতিরিক্ত ব্যবস্থা চাপিয়ে দিচ্ছেন এবং মার্কিন আদেশ না মানা দেশগুলোকে হুমকি দিচ্ছেন। এটি উল্টো ফল দেবে, কারণ আরও বেশি দেশ মার্কিন অহংকারে ক্ষুব্ধ হচ্ছে। তারা যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে—ডলার থেকে দূরে সরে যাওয়া।’
ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস
১৯৭৯ সালের ইসলামিক রেভল্যুশনের পর থেকেই ইরান মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়ে আসছে। ১৯৯৫ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ইরানের সঙ্গে মার্কিন বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নিষিদ্ধ করেন। ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে শেষ পর্যন্ত আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট ২০টিরও বেশি সংস্থা ও তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
২০১৫ সালে ইরান যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অন্য চার স্থায়ী সদস্য, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি সই করলে সাময়িক স্বস্তি মেলে। তবে ২০১৮ সালে প্রথম মেয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন এবং সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতির আওতায় ইরানের তেল রপ্তানি, জাহাজ শিল্প ও আর্থিক খাতের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।





