ই-১ এলাকায় ইসরাইলের বড় বসতি মালে আদুমিমকে অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের সঙ্গে যুক্ত করে একটি ধারাবাহিক ইসরাইলি বসতি করিডর গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। মালে আদুমিম জেরুজালেমের প্রায় ৭ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। এই করিডর তৈরি হলে ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের চলাচল আরও কঠিন হবে। দুই পাশের অনেক ফিলিস্তিনি জনপদও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় অধিকৃত ভূখণ্ডে ইসরাইলি বসতি নির্মাণ অবৈধ। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর এর আগে ই-১ প্রকল্পকে ইসরাইলের দখলদারত্ব পাকাপোক্ত করার ‘গুরুতর ও বেআইনি পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। জাতিসংঘের মহাসচিবও বলেছেন, ওই এলাকায় বসতি নির্মাণ আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের প্রস্তাবের সরাসরি পরিপন্থী।
ই-১ প্রকল্পের শুরু যেভাবে
ই-১ নামটি এসেছে ‘ইস্ট-১’ থেকে। এই এলাকার পরিকল্পনা প্রথম করা হয় ১৯৯১ সালে ইসরাইলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক শামিরের সময়ে। ১৯৯৪ সালে প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিনের সময় তা আরও এগিয়ে নেয়া হয়। তবে আন্তর্জাতিক চাপের কারণে সেখানে আবাসিক নির্মাণের পরিকল্পনা বারবার স্থগিত হয়েছে। ২০০৪ সালে ইসরাইল ই-১ এলাকায় প্রাথমিক অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করে। পরে রাস্তা ও একটি পুলিশ সদর দপ্তর নির্মাণ করা হয়। কিন্তু হাজার হাজার আবাসিক ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা আটকে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন সরকার সতর্ক করে আসছিল, ই-১ এলাকায় বসতি নির্মাণ হলে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সংহতি নষ্ট হবে।
২০২২ সালেও যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে প্রকল্পটি এগিয়ে নেয়া হয়নি। কিন্তু ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার বসতি সম্প্রসারণের জন্য তুলনামূলক অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ পেয়েছে। নেতানিয়াহুর সরকার অতি ডানপন্থি দলগুলোর ওপরও ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এসব দল ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে।অতি ডানপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ বসতি প্রশাসনের দায়িত্বে রয়েছেন। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবস্থিত একটি অবৈধ ইসরাইলি বসতিতে তার নিজেরও বসবাস রয়েছে। তিনি ই-১ প্রকল্পকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ঠেকানোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছেন। ২০২৫ সালে প্রকল্পটি এগিয়ে নেয়ার সময় তিনি বলেছিলেন, এর অনুমোদন ‘ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণাকে কবর দেবে’।
ই-১ প্রকল্পে কী হবে
ইসরাইল প্রায় ১২ বর্গকিলোমিটার ফিলিস্তিনি ভূমিতে মালে আদুমিম বসতি সম্প্রসারণ করে ই-১ এলাকায় প্রায় ৩ হাজার ৪০০টি বসতি আবাসন নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। বৃহত্তর এই প্রকল্পে হোটেল ও নতুন সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। সর্বশেষ টেন্ডারটি ইসরাইলের নির্মাণ ও আবাসন মন্ত্রণালয় আহ্বান করেছে। এতে ই-১ এলাকার অনুমোদিত দুটি নির্মাণ পরিকল্পনার একটির আওতায় ১ হাজার ২৩৪টি আবাসন নির্মাণের কথা রয়েছে। ই-১ এলাকার অবস্থানের কারণেই প্রকল্পটি এত বিতর্কিত। মালে আদুমিম ও আশপাশের ইসরাইলি বসতি অঞ্চল ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের গভীরে জর্ডান উপত্যকার দিকে বিস্তৃত। ফলে সেখানে বসতি সম্প্রসারণের কারণে ওই এলাকায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনিরা আরও চাপের মুখে পড়বেন।
ঝুঁকিতে প্রায় ৩,৭০০ ফিলিস্তিনি
ই-১ এলাকায় ১৮টি জনপদে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ ফিলিস্তিনি বসবাস করেন। তাদের বেশির ভাগই বেদুইন। ইতিমধ্যে তাদের অনেকে বাড়িঘর ধ্বংস, বাস্তুচ্যুতি এবং মৌলিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছেন। এই জনপদগুলোর মধ্যে রয়েছে খান আল-আহমার। ই-১ বসতি করিডরের সরাসরি পথে থাকা এই বেদুইন গ্রামটি দীর্ঘদিন ধরে উচ্ছেদ ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকিতে রয়েছে।
ই-১ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত সড়ক নির্মাণের জন্য ২০২৫ সালের মার্চে ইসরাইল ৩৩ কোটি ৫০ লাখ শেকেল বা প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ ডলার বরাদ্দ করে। ফিলিস্তিনিদের যানবাহনকে ই-১ ও মালে আদুমিম এলাকা থেকে সরিয়ে পৃথক পথে নেয়ার উদ্দেশ্যে ওই সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। এরপর ২০২৬ সালের মে মাসে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ পূর্ব জেরুজালেমের কাছে আল-ইজারিয়াহ এলাকায় প্রায় ৫০টি ফিলিস্তিনি দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেয়। ই-১-সংযুক্ত ওই সড়ক নির্মাণের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এই উচ্ছেদ করা হয়েছে বলে জানা যায়।
আদালতে মামলা চলার মধ্যেই টেন্ডার
ই-১ প্রকল্পের বিরুদ্ধে একটি আইনি চ্যালেঞ্জ এখনো জেরুজালেম জেলা আদালতে বিচারাধীন। ইসরাইলি মানবাধিকার সংগঠন ইর আমিম জানিয়েছে, ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের পক্ষে করা ওই আবেদনের সঙ্গে ইর আমিম, পিস নাউ ও বিমকমও যুক্ত রয়েছে। জুনে আদালত ইসরাইলি সরকারকে ১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত জবাব দিতে নির্দেশ দেন। ইর আমিমের দাবি, টেন্ডার প্রকাশের আগে মামলাকারীদের জানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সরকার। কিন্তু তা না করেই টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে।
সংগঠনটির মতে, আদালতে মামলা চলার মধ্যেই প্রকল্পটি এগিয়ে নেয়ায় বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি সরকারের শ্রদ্ধা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আসন্ন ইসরাইলি নির্বাচনের আগে প্রকল্পটি দ্রুত এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলছে বলেও তারা অভিযোগ করেছে। সর্বশেষ টেন্ডারে অংশ নেয়ার সময়সীমা ১৯ অক্টোবর। এর মাত্র আট দিন পর ২৭ অক্টোবর ইসরাইলে নির্বাচন হওয়ার কথা।
পশ্চিমা দেশগুলোর তীব্র প্রতিক্রিয়া
ই-১ প্রকল্পের টেন্ডার আহ্বানের ঘটনায় যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, কানাডা ও নরওয়ে যৌথভাবে নিন্দা জানিয়েছে। দেশগুলোর নেতারা বলেছেন, ই-১ প্রকল্প ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের ভৌগোলিক সংহতি নষ্ট করবে এবং দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তারা ইসরাইলকে অবিলম্বে টেন্ডার প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে টেন্ডারে অংশ না নেয়ার সতর্কতা দেয়া হয়েছে। দেশগুলো বলেছে, এতে কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার আইনি ও সুনামগত ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড এ ঘটনায় ইসরাইলের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতকে তলব করে টেন্ডার প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। এর জবাবে ইসরাইলের অতি ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ব্রিটিশ সরকারের সমালোচনা করেছেন।
এই নিন্দা কি বসতি সম্প্রসারণ থামাতে পারবে
ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে আন্তর্জাতিক নিন্দা নতুন নয়। কিন্তু ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, নিন্দা ও বিবৃতির বাইরে ইসরাইলকে থামাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ফিলিস্তিনি মানবাধিকারকর্মী উবাই আল-আবউদি বলেছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিন্দা ইসরাইলকে বসতি সম্প্রসারণ থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তার মতে, কার্যকর ব্যবস্থা বা নিষেধাজ্ঞা না থাকলে ইসরাইল আন্তর্জাতিক সমালোচনার মধ্যেই মাঠপর্যায়ে বাস্তবতা বদলে যেতে থাকবে।
ফিলিস্তিন ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক ডিপ্লোম্যাসির সহপরিচালক ইনেস আবদেল রাজেকও মনে করেন, দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তা যথেষ্ট নয়। তার মতে, কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ফলে ই-১ প্রকল্পকে শুধু ১ হাজার ২৩৪টি নতুন আবাসন নির্মাণের পরিকল্পনা হিসেবে দেখছেন না সমালোচকেরা। তাদের কাছে এটি ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের ভৌগোলিক কাঠামো বদলে দেয়ার এবং ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা আরও সংকুচিত করার একটি বড় পদক্ষেপ।





