তালেবান শাসনের ৫ বছরে শক্ত রাষ্ট্রকাঠামোর আড়ালে বাড়ছে অর্থনৈতিক সংকট

তালেবান সরকারের পতাকা
তালেবান সরকারের পতাকা | ছবি: সংগৃহীত
0

তালেবান শাসনের ৫ বছরে দুর্বল রাষ্ট্রীয় কাঠামো আগের চেয়ে শক্তিশালী হলেও এখনও আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন আফগানিস্তানের অর্থনীতি; বেড়েছে বাণিজ্য ঘাটতি, সংকটে খাদ্য নিরাপত্তা। প্রকাশ্য সহিংসতা কমলেও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাবে নেই বিদেশি বিনিয়োগ। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেকারত্ব, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় অনিশ্চিত নারীদের ভবিষ্যতও। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে ২০২১ সালে ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের পর তালেবান শাসনে কতটা বদলেছে আফগানদের জীবন।

সাল ২০২১, আফগানিস্তানের হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছেড়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সি-১৭ গ্লোবমাস্টার সামরিক কার্গো বিমান। রানওয়েতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে শত শত আফগান। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিমানের গায়ে ঝুলে হলেও দেশ ছাড়তে চান তারা। দৃশ্যটি আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের পুনরুত্থানের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত।

২০২১ এর ১৫ আগস্ট থেকে কাবুলের মসনদে ফের জেঁকে বসে তালেবান শাসকগোষ্ঠী। আর, ২০ বছরের অভিযান শেষে ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি মার্কিন নাগরিক, সহযোগী আফগান এবং ভিনদেশীদের নিয়ে দেশে ফিরে যায় যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা। বহু আফগান পালিয়ে যান পাকিস্তান ও ইরানে।

সম্প্রতি তালেবানদের ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের ৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। তাই প্রশ্ন ওঠে, ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের পর তালেবান শাসনে কতটা বদলেছে আফগানদের জীবন।

গত ৫ বছরে কাবুলের অর্থনীতি আরও সঙ্কুচিত ও বিচ্ছিন্ন হয়েছে। ২০২৩ সালে আফগানিস্তানের সবশেষ বাজেট ছিলো ২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২১ সালের ৬ বিলিয়ন ডলারের বাজেটের অর্ধেকেরও কম। ২০২৪ সালে এসে সরকারি পেনশন সুবিধাও বাতিল করেছে তালেবান সরকার। অর্থনৈতিক উৎপাদন বাড়লেও পাকিস্তান ও ইরান থেকে লাখ লাখ আফগান দেশে ফিরে আসায় মিলছে না উন্নয়নের খতিয়ান। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, সরবরাহ ঘাটতি আর চাহিদা বাড়তে থাকায় ২০২৬ সালের মার্চে আফগানিস্তানের মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৬।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাবে গত ৫ বছরে কমেছে বিদেশি বিনিয়োগ। গার্ডিয়ানের পূর্বাভাস ২০২৬ সালে মানবিক সহায়তার প্রয়োজন হবে ২ কোটি ১৯ লাখ আফগানের। এরমধ্যে শিশুর সংখ্যা অর্ধেকের বেশি, প্রায় ১ কোটি ১৬ লাখ। আর এ মুহূর্তে দেশটিতে তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে ৫ বছরের কম বয়সী ৩৫ লাখ শিশু।

২০২১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত মানবিক ও উন্নয়ন সহায়তা হিসেবে আফগানিস্তানকে ৩শ কোটি ডলারেরও বেশি অনুদান দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে তা বাতিল করেন। বন্ধ হয়ে যায় মানবিক সহায়তার প্রায় ৪৫ শতাংশের যোগান। এ তহবিল ঘাটতির কারণে সাড়ে ৪০০ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হয়েছে বা কার্যক্রম সীমিত করেছে। ২০২৫ সালে দেশটিতে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিতদের হার ২৩ শতাংশ, যা আগের বছর ছিলো ১৬ শতাংশ।

ক্ষমতা দখলের পর তালেবান সরকার নারীদের অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিলেও শিগগিরই মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বন্ধ করে দেয়। পরে নারীদের কর্মসংস্থান ও পুরুষ অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণের ওপরও নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ২০২২ সালে পাবলিক পার্ক ও জিমে প্রবেশে বাধা দেয়া, ২০২৪ সালে নারীদের জনসমক্ষে উচ্চস্বরে কথা বলা নিষিদ্ধ করা, বাল্যবিবাহকে স্বীকৃতি দেয়ার মতো নানা কারণে অনিশ্চিত আফগান নারীদের ভবিষ্যৎ।

তালবানরা ক্ষমতায় ফেরার আগে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ছিল প্রতি ৬ জনে একজন। বর্তমানে তা ২০ জনে ১ জন। কর্মজীবী নারীদের ১৮ শতাংশ ধাত্রী, আর গণমাধ্যমে কর্মরত ৮০ শতাংশ নারীই হারিয়েছেন চাকরি। নারীদের কাজ করতে না দেয়ায় দেশটিতে এরই মধ্যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৮৪ মিলিয়ন ডলারের। আর বাল্যবিবাহের নেই কোনো সরকারি রেকর্ড, এনজিওগুলোও আছে বিধিনিষেধের আওতায়।

ইরান ও পাকিস্তান অবৈধ অভিবাসীদের দমন করতে শুরু করায় ২০২৩ এর পর প্রায় ৬০ লাখ আফগান দেশে ফিরেছেন। জাতিসংঘের পূর্বাভাস চলতি বছরের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আরও ফিরবেন ২৭ লাখ। এতে করে কাবুলের আবাসন, চাকরি, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়বে।

পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনা ও সম্পর্কের অবনতি হলেও তালেবানকে স্বীকৃতি দিয়েছে রাশিয়া। তালেবান-নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতদের গ্রহণ করেছে চীন ও আরব আমিরাত। সম্পর্ক গভীর হচ্ছে নয়াদিল্লির সঙ্গেও। ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অভিবাসন নিয়ে আলোচনা করতেও গেছেন তালেবান নেতারা।

এ সব কিছু ইঙ্গিত করে বৈশ্বিক শাসন কাঠামো থেকে বের হয়ে দেশ চালানো কঠিন। তাই, আন্তর্জাতিক অঙ্গনের স্বীকৃতিই আপাতত ভাবাচ্ছে তালেবানদের। এ সমস্যার সমাধান হলে অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে আফগানিস্তান।

জেআর