বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, বেইজিংয়ে অসুস্থতাজনিত কারণে ঝুর মৃত্যু হয়েছে। ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির এক শোকবার্তায় ঝুকে ‘একজন চমৎকার পার্টি সদস্য, দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও অনুগত কমিউনিস্ট যোদ্ধা এবং একজন অসাধারণ শ্রমজীবী শ্রেণির বিপ্লবী, রাষ্ট্রনায়ক এবং পার্টি ও রাষ্ট্রের নেতা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
‘বস ঝু’ নামে পরিচিত এই নেতা তৎকালীন শীর্ষ নেতা দেং শিয়াওপিংয়ের অধীনে চীনের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও সংস্কারে রূপান্তরকারী ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি প্রথমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান এবং পরে ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত প্রিমিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
অর্থনীতিবিদ আর্থার ক্রোবার তার ‘চায়না’স ইকোনমি’ বইয়ে লিখেছেন, ‘প্রিমিয়ার হিসেবে এক মেয়াদেই তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর (এসওই) পুনর্গঠন ও ছোট করা, ব্যাংকিং ব্যবস্থার পুনঃপুঁজিকরণ ও সংস্কার, আবাসন বাজারের বেসরকারিকরণ এবং দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) চীনের অন্তর্ভুক্তির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। ঝুকে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের ইতিহাসে সবচেয়ে কার্যকর অর্থনৈতিক নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।’
উত্থানের পথ
ঝুর শীর্ষে পৌঁছানোর পথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। ১৯২৮ সালের অক্টোবরে দক্ষিণাঞ্চলীয় হুনান প্রদেশের রাজধানী চাংশায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। মাও সেতুংয়ের সঙ্গে তার বাড়ি ছিল একই এলাকায়। বেইজিংয়ের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করার পর ১৯৫০-এর দশকের শেষে মাওয়ের চালু করা ‘দক্ষিণপন্থি-বিরোধী’ শুদ্ধি অভিযানে তিনি রোষানলে পড়েন।
১৯৫৭ সালের ‘শত ফুল ফুটতে দাও’ প্রচারণার সময় মাও যখন তার নীতির সমালোচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন, তখন ঝু উচ্চ প্রবৃদ্ধির উপর অতিরিক্ত জোর দেয়ার নীতির ত্রুটি তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন। এই আসক্তিই পরে ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২ সালের মধ্যে ‘গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ড’ ও দুর্ভিক্ষে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ঝুর মতপ্রকাশের জন্য তাকে ‘দক্ষিণপন্থি’ আখ্যা দিয়ে ১৯৫৮ সালে পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয়। মাওয়ের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের (১৯৬৬-৭৬) সময় হাজার হাজার চীনা বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে ঝুকেও গ্রামে শ্রমিকের কাজে পাঠানো হয়। মাওয়ের মৃত্যুর পর দেং শিয়াওপিং তাকে পুনর্বাসন করেন।
সাংহাই থেকে বেইজিং
১৯৮৮ সালে ঝুকে সাংহাইয়ের নেতৃত্ব দিতে পাঠানো হয়, প্রথমে মেয়র এবং পরে পার্টি প্রধান হিসেবে। তিনি তৎকালীন কৃষিজমি পুদংকে সংস্কারের একটি পরীক্ষামূলক এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার নেতৃত্ব দেন এবং বিদেশি বিনিয়োগের জন্য সাংহাইকে উন্মুক্ত করেন। ১৯৮৯ সালে দেংয়ের অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রথম দশকে মূল্যস্ফীতি ও দুর্নীতির মধ্যে গণতন্ত্রের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনের নৃশংস দমনের পরিপ্রেক্ষিতে ঝুকে অর্থনীতি ঠিক করার জন্য বেইজিংয়ে আনা হয়। তাকে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘পিপলস ব্যাংক অব চায়না’-এর গভর্নর এবং ভাইস প্রিমিয়ার নিয়োগ দেয়া হয়। এশীয় আর্থিক সংকটের সময় তিনি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনীতি রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখেন। এর পুরস্কার হিসেবে ১৯৯৮ সালে তিনি লি পেংয়ের স্থলাভিষিক্ত হয়ে প্রিমিয়ার হন।
ঝু রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো ভেঙে দেন। এই বেদনাদায়ক সংস্কারের কারণে লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারায় এবং রাষ্ট্র নিশ্চিত করা চাকরি ও সুবিধার ‘লোহার চালের বাটি’-র অবসান ঘটে। এছাড়া তিনি আবাসন বাজারকে উন্মুক্ত করে দেন। মাত্র পাঁচ বছরে তিনি চীনের অর্থনীতিকে রূপান্তরিত করেন এবং ২০০১ সালে ডব্লিউটিওতে চীনের অন্তর্ভুক্তির আলোচনার তদারকি করেন।





