লিবিয়ায় একদিনেই তিন সংকট: গোয়েন্দাপ্রধান হত্যা, তেল শোধনাগারে হামলা, গভর্নরের পদত্যাগ

লিবিয়ায় একদিনেই তিন সংকট: গোয়েন্দাপ্রধান হত্যা, তেল শোধনাগারে হামলা, গভর্নরের পদত্যাগ
লিবিয়ায় একদিনেই তিন সংকট: গোয়েন্দাপ্রধান হত্যা, তেল শোধনাগারে হামলা, গভর্নরের পদত্যাগ | ছবি: সংগৃহীত
0

লিবিয়ায় একের পর এক সংকট দেশটিকে নতুন করে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এই সপ্তাহে বেনগাজিতে গাড়িবোমা হামলায় পূর্বাঞ্চলের সামরিক গোয়েন্দাপ্রধান ফাউজি আল-মানসৌরি নিহত হয়েছেন। এছাড়া দেশটির বৃহত্তম সচল তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদত্যাগ করেছেন।

লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (এলএনএ) মঙ্গলবার জানিয়েছে, পূর্বাঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী বাহিনীর সামরিক গোয়েন্দাপ্রধান মানসৌরি সোমবার রাতে একটি মসজিদ থেকে বের হচ্ছিলেন। ওই সময় তার গাড়িতে যুক্ত করা বিস্ফোরক দ্রব্যের বিস্ফোরণে তিনি নিহত হন।

পূর্বাঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী এলএনএ কমান্ডার খলিফা হাফতারের ছেলে খালেদ হাফতার জানিয়েছেন, কর্তৃপক্ষ এই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। তার মতে, এই ঘটনায় ‘জঘন্য এক সন্ত্রাসী কৌশলের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।’ বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘সন্ত্রাসবাদ শুধু লিবিয়া নয়, পুরো অঞ্চলকে লক্ষ্য করে চালানো একটি প্রকল্প।’

এখন পর্যন্ত কোনো গোষ্ঠী এই হামলার দায় স্বীকার করেনি। ঝুঁকি পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফট’-এর মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিভাগের প্রধান বিশ্লেষক হ্যামিশ কিনিয়ার মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘এটি একটি বার্তা যে খলিফা হাফতারের এলএনএর আধিপত্য সত্ত্বেও পূর্ব লিবিয়ায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো ভঙ্গুর।’ বছরের পর বছর সংঘাতের পর পূর্ব লিবিয়াকে স্থিতিশীল হিসেবে দেখানোর হাফতার পরিবারের প্রচেষ্টার জন্য এই হত্যাকাণ্ড বড় ধরনের ধাক্কা বলে মনে করা হচ্ছে।

তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলা
মানসৌরি হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি রাজধানী ত্রিপোলির পশ্চিমে অবস্থিত জাওইয়া তেল শোধনাগারে সোমবার সন্ধ্যায় ড্রোন হামলার পর সৃষ্ট ভয়াবহ আগুন নেভাতে হিমশিম খাচ্ছে জরুরি বিভাগের কর্মীরা। দুই দিনে এটি এই স্থাপনায় তৃতীয় হামলা। লিবিয়ার জাতীয় তেল কর্পোরেশন জানিয়েছে, একটি ড্রোন প্রায় ৪৫ লাখ লিটার জ্বালানি ধারণকারী একটি ট্যাংকে সরাসরি আঘাত হেনেছে। এতে ট্যাংকটি ধসে পড়ে এবং কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে দিয়েছে যে আরও হামলা হলে তারা কার্যক্রম স্থগিত করতে বাধ্য হবে। এই ঘটনায় গুরুতর কেউ আহত না হলেও ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়া বেশ কয়েকজনকে চিকিৎসা দিতে হয়েছে। জাওইয়া হলো লিবিয়ার সবচেয়ে বড় সচল শোধনাগার। এখানে দৈনিক ১ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল তেল পরিশোধন করা যায়।

কিনিয়ার বলেন, ‘এই ড্রোন হামলার দায় কোনো গোষ্ঠী স্বীকার করেনি। তবে জাওইয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বী মিলিশিয়াদের সশস্ত্র সংঘর্ষের মধ্যেই এই হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা প্রধানমন্ত্রী আবদুল হামিদ আল-দ্বিবেইবাহর নেতৃত্বাধীন গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল ইউনিটির ওপর চাপ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যেই চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নরের পদত্যাগ
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে লিবিয়ার সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নর নাজি ইস্সার নামে দেয়া একটি চিঠি ছড়িয়ে পড়ার পর সংকট আরও গভীর হয়েছে। হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস ও হাই স্টেট কাউন্সিলের প্রধানদের কাছে পাঠানো ওই চিঠিতে ইস্সা তার পদে না থাকার কথা জানিয়েছেন। কারণের ‘স্পর্শকাতরতার’ কথা উল্লেখ করে তিনি এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেননি।

কিনিয়ার বলেন, ‘জাওইয়ায় তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলা, বেনগাজিতে গাড়িবোমায় গোয়েন্দাপ্রধানের হত্যাকাণ্ড এবং লিবিয়ার একজন শীর্ষ কর্মকর্তার পদত্যাগ ২৪ ঘণ্টায় ঘটে যাওয়া—এসব ঘটনা প্রমাণ করে দেশটির ভঙ্গুর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি কত দ্রুত অবনতির দিকে যেতে পারে।’

লিবিয়া এখন কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত: ত্রিপোলিতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার এবং পূর্বাঞ্চলে হাফতার সমর্থিত প্রশাসন। জ্বালানি সমৃদ্ধ এই দেশটি দৈনিক ১৩ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল উৎপাদন করলেও দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ভুগছে। ত্রিপোলি, জাওইয়া, মিসরাতাসহ বিভিন্ন শহরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিয়ে বিক্ষোভ চলছে। বিক্ষোভকারীরা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবিতে প্রধানমন্ত্রী দ্বিবেইবাহর পদত্যাগও দাবি করছেন। কিনিয়ারের ভাষায়, ‘এই ধরনের সংঘাতে লিবিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোই প্রায়ই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়, কারণ রাজনৈতিক নেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার এটিই সবচেয়ে সহজ উপায়।’

এএম