ভারতের ‘র’-এর কাজ কী, কীভাবে হয় নিয়োগ?

রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং
রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং | ছবি : সংগৃহীত
0

ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং’ বা ‘র’ (Research and Analysis Wing - RAW)। বহিঃশত্রুর হাত থেকে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, আন্তর্জাতিক সীমান্তে গোপন তথ্য সংগ্রহ এবং কভার্ট অপারেশন পরিচালনার ক্ষেত্রে এই সংস্থাটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সংস্থাটির উৎপত্তি, কাজের ধরন এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের নানা কৌতুহল রয়েছে (Research and Analysis Wing Functions & Recruitment Process)।

১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে (1965 India-Pakistan War) গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি ও ভুল বার্তার কারণে ভারত কৌশলগত সুবিধা নিতে ব্যর্থ হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতেই পৃথক বহির্দেশীয় গোয়েন্দা সংস্থা হিসেবে ‘র’ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ‘র’-এর কাজের পরিধি, কর্মী নিয়োগের ইতিহাস এবং বর্তমান আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

‘র’ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ও প্রাথমিক রূপরেখা (History & Formation of RAW)

১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি ঘোষণার সময় পাকিস্তানের কাছে অস্ত্রের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও ভারতের কাছে সেই সঠিক তথ্য ছিল না। ভারতের তৎকালীন সেনাপ্রধানের পর্যালোচনার পর ১৯৬৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ‘র’ গঠিত হয়।

  • প্রতিষ্ঠাতা নেতৃত্ব: রামেশ্বর নাথ কাও (R. N. Kao) সংস্থাটির প্রথম প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং শঙ্করণ নায়ার ছিলেন তার ২-নম্বর কর্মকর্তা।
  • শুরুর সাংগঠনিক রূপ: ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (IB) থেকে বদলি করা ২৫০ জন কর্মকর্তাকে নিয়ে নতুন এই গোয়েন্দা সংস্থার যাত্রা শুরু হয়।
  • সরাসরি নিয়োগ প্রক্রিয়া: ১৯৭১ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে সরাসরি তরুণদের নিয়োগ দেওয়া শুরু হয়। তবে বৈষম্য কাটাতে ১৯৭৩ সালের পর কঠিন প্রতিযোগিতামূলক মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা ও কঠিন ভাইভার মাধ্যমে নিয়োগের নিয়ম চালু হয়।

বর্তমান নিয়োগ ব্যবস্থা ও বিতর্ক (Modern RAW Recruitment Rules & IPS Officers)

বর্তমানে ‘র’-এর নিয়োগ পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। সরাসরি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা ও পুলিশের বিভিন্ন স্তর থেকে এখানে জনবল নেওয়া হয়।

  • আইপিএস ক্যাডারদের প্রাধান্য: বর্তমানে ‘র’-এর ৯৫ শতাংশেরও বেশি কর্মকর্তা ভারতীয় পুলিশ সেবা বা আইপিএস (Indian Police Service - IPS) থেকে প্রাক-বাছাইয়ের মাধ্যমে নির্বাচিত হন।
  • বিশেষজ্ঞ নিয়োগ: অর্থনৈতিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও রাজস্ব অপরাধ তদারকির জন্য কাস্টমস এবং আয়কর বিভাগ থেকে কিছু বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা যুক্ত করা হয়।
  • পদ্ধতিগত সমালোচনা: ভারতের গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞদের মতে, ৩০ বা তার বেশি বয়সে আইপিএস কর্মকর্তাদের গোয়েন্দা সংস্থায় আনলে ঝুঁকির প্রবণতা কমে যায়। এছাড়া ভাষা শেখা, সাইবার সিকিউরিটি, ক্রিপ্টোগ্রাফি ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক অনুসন্ধানের বিশেষ কৌশল পুলিশের চাকুরিতে শেখানো হয় না।

আরও পড়ুন:

কঠোর প্রশিক্ষণ ও বিশেষ কৌশল (RAW Agents Training Process & Krav Maga)

‘র’-এ কর্মকর্তা হিসেবে বাছাই হওয়ার পর প্রত্যেক সদস্যকে প্রাথমিক ও উচ্চতর ফিল্ড ট্রেইনিংয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

  • ভাষাগত দক্ষতা ও ফিল্ড ট্রেইনিং: কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলকভাবে নির্দিষ্ট বিদেশি ভাষা শেখানো হয়। প্রতিকূল আবহাওয়ায় টিকে থাকা, শত্রুর নজরদারি এড়িয়ে অনুপ্রবেশ এবং ছদ্মবেশ ধারণের কৌশল ফিল্ড বুথগুলোতে শেখানো হয়।
  • মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ: আত্মরক্ষার জন্য এজেন্টদের ইসরায়েলি বিশেষ মার্শাল আর্ট ‘ক্রাভ মাগা’ (Krav Maga) শেখানো হয়, যা মুখোমুখি হাতাহাতি লড়াইয়ে কার্যকর।
  • এনক্রিপশন ও ডেড লেটার বক্স: সংকেত আদান-প্রদানের জন্য এনক্রিপশন ল্যাঙ্গুয়েজ এবং গোপন তথ্য বিনিময়ের জন্য প্রাচীন ‘ডেড লেটার বক্স’ (Dead Letter Box) ব্যবহারের কৌশল শেখানো হয়।

কূটনৈতিক আন্ডারকাভার পোস্টিং ও বহিষ্কারের ঝুঁকি (Undercover Diplomat Missions & Expulsion)

বিদেশে বিভিন্ন মিশন পরিচালনার সুবিধার্থে ‘র’ এজেন্টদের ভারতীয় দূতাবাসগুলোতে (Indian Embassies abroad) ডিপ্লোম্যাট বা ‘আন্ডারকাভার’ হিসেবে পোস্টিং দেওয়া হয়।

  • ছদ্মনাম ও ভুয়া পরিচয়: তথ্য গোপন রাখতে অনেক কর্মকর্তা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের আসল নাম বদলে ছদ্মনাম ব্যবহার করতে হয়।
  • পরিচয় প্রকাশ ও বহিষ্কার: পরিচয় উন্মোচিত হলে সংশ্লিষ্ট দেশকে তাৎক্ষণিকভাবে ছাড়তে হয়, যাকে কূটনৈতিক ভাষায় ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ (Persona Non Grata) বলা হয়। এছাড়া দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মধ্যকার বিশেষ প্রোটোকল মেনে গোয়েন্দাদের গতিবিধি ও সীমানা রক্ষা করতে হয়।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW)-এর কাজ কী? যেভাবে নিয়োগ পান র-এর এজেন্টরা

একনজরে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর কাজের পরিধি, ঐতিহাসিক পটভূমি, কর্মী নিয়োগ পদ্ধতি ও উচ্চতর প্রশিক্ষণের সারসংক্ষেপ

বিষয়বস্তু (Topic) বিবরণ ও ইতিহাস (Details & History) নিয়োগ ও কার্যপ্রক্রিয়া (Process & Operations) প্রধান উদ্দেশ্য (Key Objective)

প্রতিষ্ঠার পটভূমি

১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে গোয়েন্দা ব্যর্থতার পর ১৯৬৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ‘র’ প্রতিষ্ঠা পায়।

প্রথম প্রধান রামেশ্বর নাথ কাও এবং ২৫০ জন আইবি অফিসারকে নিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়।

বহির্দেশীয় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ

সংস্থার প্রধান কাজ

ভারতের বাইরে থেকে গোপন সামরিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত তথ্য সংগ্রহ করা।

কভার্ট অপারেশন পরিচালনা, বিদেশি সাইবার ও কৌশলগত হুমকির ওপর নজরদারি চালানো।

জাতীয় নিরাপত্তা সুসংহতকরণ

বর্তমান নিয়োগ পদ্ধতি

বর্তমানে ৯৫% কর্মকর্তা ভারতীয় পুলিশ সেবা (IPS) থেকে নির্বাচিত হন।

অর্থনৈতিক তথ্যের জন্য কাস্টমস ও আয়কর বিভাগ এবং সিভিল সার্ভিস অফিসারদের নেওয়া হয়।

দক্ষ ও অভিজ্ঞ পেশাদার নির্বাচন

বিশেষ প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা

বিদেশি ভাষা শিক্ষা, প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকা ও অনুপ্রবেশের বিশেষ ফিল্ড ট্রেনিং।

ইসরায়েলি মার্শাল আর্ট ‘ক্রাভ মাগা’, এনক্রিপশন ও ‘ডেড লেটার বক্স’ কৌশল শেখানো হয়।

আত্মরক্ষা ও গোপন তথ্য আদান-প্রদান

আন্ডারকাভার ও ডিপ্লোম্যাট পোস্টিং

বিদেশে ভারতীয় দূতাবাসগুলোতে কর্মকর্তাদের কভার্ট বা ছদ্মনামে ডিপ্লোম্যাট হিসেবে পাঠানো হয়।

পরিচয় প্রকাশ বা 'পারসোনা নন গ্রাটা' হলে দ্রুত নিজ দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি নিয়ম বহাল থাকে।

ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও তথ্য গোপন রাখা

ভারতের গুপ্তচর সংস্থা র এর কাজ কি (functions of RAW India), র এজেন্ট কিভাবে হওয়া যায় (how to join Research and Analysis Wing), ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র নিয়োগ নিয়ম (RAW India recruitment procedure), র গোয়েন্দাদের বিশেষ ট্রেনিং (training process of RAW agents), র এর ইতিহাস ও কভার্ট অপারেশন (RAW history and covert operations)

এসআর