এআই দিয়ে ভাইরাস তৈরি; চিকিৎসায় বিপ্লব নাকি নতুন হুমকি?

ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও মানুষের জেনেটিক কোডে প্রশিক্ষিত এআই মডেল
ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও মানুষের জেনেটিক কোডে প্রশিক্ষিত এআই মডেল | ছবি: বিবিসি
0

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ নতুন ধরনের ভাইরাস তৈরি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের একদল বিজ্ঞানী। গবেষণাগারে সফলভাবে বংশবৃদ্ধি করতে সক্ষম এ ভাইরাসগুলো ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করার জন্য বানানো হলেও মানুষের জন্য কোনো ঝুঁকি তৈরি করবে না। বিজ্ঞানে এটিকে একটি ‘বড় ধরনের মোড় ঘোরানো ঘটনা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা রোগ নিরাময়ে নতুন যুগের দ্বার খুলে দিতে পারে। সম্প্রতি বিবিসি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ব্রায়ান হাই বিবিসিকে জানিয়েছেন, এ প্রথম কোনো এআই মডেল ব্যবহার করে ভাইরাসের সম্পূর্ণ জিনোম বা জেনেটিক কোড তৈরি করা সম্ভব হয়েছে, যা কোষের ভেতরে গিয়ে নিজেই বংশবৃদ্ধি করতে পারে। তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন এক অধ্যায়।’

চ্যাটজিপিটির মতো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল যেমন লেখার পরবর্তী শব্দ অনুমান করতে পারে, একইভাবে ‘ইভো১’ ও ‘ইভো২’ নামের এআই মডেল দুটি জীবনের ভাষা বা জেনেটিক কোডের ধারাবাহিকতা অনুমান করতে পারে। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, উদ্ভিদ ও মানুষের জেনেটিক কোড দিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়ার পর মডেলগুলোকে ‘ব্যাকটেরিওফাজ’ নামক এক বিশেষ ধরনের ভাইরাস তৈরির উপযোগী করে তোলা হয়। এই ব্যাকটেরিওফাজ শুধু নির্দিষ্ট প্রজাতির ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করে।

বিজ্ঞানীরা এআই দিয়ে তৈরি ৩০২টি নকশার মধ্যে সবচেয়ে সম্ভাবনাময়গুলো গবেষণাগারে যাচাই করেন। এর মধ্যে ১৬টি ভাইরাস ‘ই. কোলাই’ ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সফল হয়। গবেষণাগারে পিএইচডি শিক্ষার্থী স্যামুয়েল কিং বলেন, ভোরের দিকে যখন পেট্রি ডিশে ব্যাকটেরিয়ার স্তরে স্পষ্ট দাগ দেখা গেল, তখন তারা বুঝতে পারলেন ভাইরাসগুলো কাজ করছে। এই সাফল্যের খবর পুরো দলের কাছে যাওয়ার পর সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাততালি দিয়ে ওঠেন।

অ্যান্টিবায়োটিকে কাজ হয় না—এমন সংক্রমণের চিকিৎসায় এই নতুন ব্যাকটেরিওফাজ যুগান্তকারী পথ খুলে দিতে পারে। তবে এই সাফল্য একই সঙ্গে নিরাপত্তার প্রশ্নও তুলেছে। বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত এক মন্তব্য প্রতিবেদনে জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটির ড. থমাস ইংলসবি ও ড. মরিৎস হানকে সতর্ক করে বলেন, এই গবেষণা জৈব নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে। এখন আর প্রশ্ন এই নয় যে, এআই দিয়ে ভাইরাসের জিনোম তৈরি করা যাবে কি না; বরং প্রশ্ন হল—এটি মানুষের কোনো ক্ষতি না করেই ব্যবহার করা সম্ভব হবে কি না।

তবে গবেষকরা নিরাপত্তার বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। জটিল কোনো প্রাণীকে সংক্রমিত করতে পারে এমন ভাইরাসগুলো ডেটাবেস থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। মানুষকে সংক্রমিত করে এমন ভাইরাসের বদলে শুধু ব্যাকটেরিওফাজের ওপর গবেষণা করা হয়েছে এবং পুরো কাজটি সুরক্ষিত গবেষণাগারে সম্পন্ন হয়েছে। স্পেনের পম্পেউ ফাব্রা ইউনিভার্সিটির সিন্থেটিক বায়োলজি ল্যাবের অধ্যাপক মার্ক গুয়েল বলেন, ‘মানবজাতির ইতিহাসে এই প্রথম আমরা কম্পিউটারে বসে জীববিজ্ঞানের নকশা করা শুরু করেছি।’

এএম