মালির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে গত ২৫ জুলাই প্রচারিত এক ফুটেজে রাজধানী বামাকোতে সাঁজোয়া যানের বিশাল বহর প্রবেশ করতে দেখা গেছে। ফুটেজটির সত্যতা যাচাই করা হয়েছে। প্রতিবেদকেরা বলছেন, এই বহরটি টোগোর লোমে বন্দর থেকে সেখানে পৌঁছেছে।
বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণ করা জাহাজের গতিবিধি সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ৯ জুলাই লোমে বন্দরে নোঙর করে রাশিয়ার নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন একটি মালবাহী জাহাজ ‘মিখাইল ব্রিতনেভ’। বিশেষজ্ঞরা স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে বলেছেন, বামাকোতে দেখা যাওয়া ট্রাক, সাঁজোয়া যান ও হালকা পদাতিক যানই ওই জাহাজে পরিবহন করা হচ্ছিল।
জাহাজের গতিবিধি সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, মিখাইল ব্রিতনেভ গত ১৮ জুন রাশিয়ার বাল্টিস্ক বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে। এটি উত্তর সাগর পাড়ি দিয়ে ইংলিশ চ্যানেলে প্রবেশ করে। বিবিসি ভেরিফাই জানতে পেরেছে, ইংলিশ চ্যানেলের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় রাশিয়ার একটি রোপুচা-শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এটিকে পাহারা দিয়ে নিয়ে গেছে। এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সরবরাহ থেকে এটাই স্পষ্ট যে রাশিয়া মালির ক্ষমতাসীন সামরিক জান্তার প্রতি সমর্থন আরও জোরদার করছে। জিহাদি গোষ্ঠী জামায়াত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন (জেএনআইএম) এবং তুয়ারেগ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নেতৃত্বে বিদ্রোহী অভিযানের সাফল্যে মালির জান্তা সরকার নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। বিদ্রোহীরা দেশটির উত্তরাঞ্চলের বিশাল এলাকা দখল করে নিয়েছে।
২০২২ সালে ফ্রান্স তাদের সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের পর থেকে মালির সামরিক সরকারকে সহায়তা করছে রাশিয়া। এর বিনিময়ে ক্রেমলিন পাচ্ছে নগদ অর্থ এবং খনি ও স্বর্ণখনিতে বিশেষ সুবিধা। শুরুতে রাশিয়ার ভাড়াটে বাহিনী ওয়াগনার সেখানে মোতায়েন ছিল। তবে পরে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ‘আফ্রিকা কোর’ এই দায়িত্ব নিয়ে নেয়।
বিবিসি ভেরিফাই এর আগে বিদ্রোহীদের ওপর আফ্রিকা কোরের বিমান হামলার ফুটেজের সত্যতা নিশ্চিত করেছিল। তবে দেশের উত্তরাঞ্চলজুড়ে বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রা থামাতে হিমশিম খাচ্ছে বাহিনীটি। আলদেবারান থ্রেট কনসালট্যান্টসের বিশ্লেষক চার্লি ওয়ের্ব বলেন, নতুন এই সরবরাহ মালি ও রাশিয়ার বাহিনীর শক্তি বাড়াতে সাহায্য করবে; যাতে তারা বিদ্রোহীদের দখলে যাওয়া এলাকাগুলোতে পাল্টা অভিযান চালাতে পারে।
মিখাইল ব্রিতনেভের ওপর ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। গতিবিধির তথ্য বলছে, দুই সপ্তাহ আগে চ্যানেল পাড়ি দেয়ার পরই এটি নিজের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে দেয়। টোগো বন্দরে নোঙরের প্রস্তুতির সময়ই কেবল এটি আবার ট্র্যাকিংয়ে ধরা পড়ে। যেসব বিশেষজ্ঞ বাল্টিস্ক বন্দর ছাড়ার আগে তোলা স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করেছেন, তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই জাহাজে সাধারণ ব্যবহারের ট্রাক, বিটিআর-শ্রেণির সাঁজোয়া যান ও হালকা পদাতিক যানসহ নানা ধরনের সামরিক সরঞ্জাম ছিল।
মালির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, এই যানগুলোকে টোগো ও বুরকিনা ফাসোর ভেতর দিয়ে পরিবহন করা হয়। বুরকিনা ফাসোতেও ক্ষমতায় রয়েছে মস্কো-সমর্থিত একটি সামরিক জান্তা। ক্রেমলিনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করছে টোগো সরকার। গত বছরের শেষদিকে দেশটি মস্কোর সঙ্গে একটি সামরিক সহযোগিতা চুক্তিও স্বাক্ষর করেছে। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান জেনস-এর বিশ্লেষকেরা বলেছেন, এই যানগুলো রসদ সরবরাহ, পরিকল্পনা ও কৌশলগত পদক্ষেপ এবং সরাসরি যুদ্ধ অভিযানে ব্যবহার করা হতে পারে।
বিবিসি ভেরিফাই জানতে পেরেছে, পশ্চিম আফ্রিকায় সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো একাধিক জাহাজের যাত্রার প্রধান বন্দর হয়ে উঠেছে বাল্টিস্ক। ফেব্রুয়ারিতে সেখান থেকে সামরিক যান বলে ধারণা করা পণ্য বোঝাই করে ‘সাবেত্তা’ নামের একটি জাহাজ ছাড়ে। জাহাজটি নোঙর করে গিনির কনাক্রি বন্দরে। এই বন্দর অনেক দিন ধরেই রাশিয়া থেকে পশ্চিম আফ্রিকার আঞ্চলিক মিত্রদের কাছে অস্ত্র সরবরাহের জন্য পরিচিত। এ ছাড়া ৬ জুন বাল্টিস্কে সামরিক যান বোঝাই করার সময় আরেকটি ট্যাংকারকে দেখা গেছে, যদিও এটি জাহাজ ট্র্যাকিং তথ্যে ধরা পড়েনি।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মালির সামরিক জান্তা যুদ্ধক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি ধাক্কার মুখে পড়েছে। বিদ্রোহী যোদ্ধারা উত্তরাঞ্চলীয় শহর আনেফিসে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। নিওনো ও মধ্য মালির অন্যান্য এলাকায়ও সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। এ মাসের শুরুতে চালানো এক অতর্কিত হামলার পর অন্তত ১৯ জন মালিয়ান সেনাকে সংক্ষিপ্তভাবে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার যুদ্ধাপরাধ হিসেবে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
তবে ওয়ের্ব বলেন, এই সরবরাহ প্রমাণ করে যে ক্রেমলিন মিত্র জান্তা সরকারকে রক্ষায় শক্ত অবস্থান নিচ্ছে। তার ভাষ্য, ‘গত ২৫ এপ্রিল যুদ্ধ নতুন এক পর্যায়ে যাওয়ার পর থেকে ক্রেমলিন নতুন সেনা, অস্ত্র ও সরঞ্জাম পাঠিয়ে ধারাবাহিক সামরিক সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। এই সরবরাহ এই বার্তাই দিচ্ছে যে সাম্প্রতিক ধাক্কার পরও মালি এখনো আফ্রিকায় রাশিয়ার কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে এবং জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বামাকোর লড়াইয়ে আফ্রিকা কোর একটি বড় স্তম্ভ।’





