তবে যেভাবেই এই চুক্তি হোক না কেন, এটি উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার সূচনা করেছে বলেই মনে করা হচ্ছে। এই প্রতিযোগিতার প্রভাব আগামী বছরগুলোতে গোটা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের দুই সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি—সৌদি শাসক এমবিএস এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) প্রেসিডেন্ট ও আবুধাবির শাসক মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের (এমবিজেড) মধ্যকার জটিল সম্পর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে।
২০১৫ সালে এমবিএস যখন সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন, তখন এমবিজেড ছিলেন একজন অভিজ্ঞ আঞ্চলিক নেতা। শুরুর দিকে তিনি এমবিএসের পরামর্শদাতার ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং ওয়াশিংটনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলে তার পরিচিতি গড়ে তুলতে সহায়তা করেছিলেন।
তবে এক সময়ের সেই উষ্ণ সম্পর্ক অনেক আগেই ফিকে হয়ে গেছে। এখন এটি রীতিমতো ব্যক্তিগত আধিপত্যের লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। দুই দেশের সহযোগিতা এখন পুরোনো ইতিহাস। বর্তমানে দুই দেশের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মকভাবে প্রতিযোগিতা করছে। তেল উৎপাদন ব্যবস্থাপনা নিয়ে মতানৈক্যের জেরে গত মে মাসে সৌদির নেতৃত্বাধীন তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক থেকে বেরিয়ে গেছে ইউএই। এছাড়া আবুধাবি দৈনিক আরও কয়েক লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে তেলের মূল্যযুদ্ধের ইঙ্গিত বহন করছে।
এর প্রভাব গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে অনুভূত হবে। কারণ পরস্পরবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা (জিসিসি) এখন কার্যত একটি আলোচনা মঞ্চে পরিণত হয়েছে, যেখানে অর্থবহ কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। এই অঞ্চলের দেশগুলোকে একটি মাত্র বিষয়ই এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে, তা হলো—ইরানের প্রতি সম্মিলিত বৈরিতা এবং ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে রাখার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা।
এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এখন স্পষ্ট নয়, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতা ছাড়ার পর তা কেমন হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এর অর্থ, ভবিষ্যতে এমবিএস এবং এমবিজেডের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতাই মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। বহু বছর ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্যিক হাব হিসেবে দুবাইয়ের যে অবস্থান ছিল, সৌদির ভিশন ২০৩০-এর কারণে তা এখন হুমকির মুখে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন রিয়াদে তাদের প্রধান কার্যালয় রাখতে হচ্ছে। এছাড়া সৌদি আরব পর্যটন, প্রযুক্তি ও আর্থিক সেবা খাতে বিপুল বিনিয়োগ করছে এবং এই অঞ্চলের আকাশ ও নৌ লজিস্টিকস হাব হয়ে ওঠার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
সমালোচকদের মতে, ভিশন ২০৩০ একটি জাঁকজমকপূর্ণ বিপণন কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয় এবং দেশের পুরো কৌশলটি পরামর্শকদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। এই কথা সত্যি হলেও এমবিএস তার নিজের ক্ষমতা সুসংহত করেছেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের নির্মূল করেছেন এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজের পরিবারের ভিত্তি মজবুত করেছেন।
অন্যদিকে, এমবিজেড কৌশলগত পরিকল্পনার কাজ কারও ওপর ছেড়ে না দিয়ে নিজের হাতেই রেখেছেন। তার মডেল হলো—ছোট রাষ্ট্র, কিন্তু বৈশ্বিক পরিসরে বিশাল প্রভাব। ‘ছোট্ট স্পার্টা’র মতো একটি রাষ্ট্র হয়ে ওঠা, যাকে ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অচল হয়ে পড়বে। তবে তার ক্ষমতার পরিধি কিছুটা সীমিত। তাকে অন্য ছয়টি আমিরাতের বিষয়েও নজর রাখতে হয়, ফলে সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বীর মতো তিনি অতটা মুক্তভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।
এমবিএস নিজেকে আরও বাস্তববাদী হিসেবেও প্রমাণ করেছেন। ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যে অংশ নেয়নি ইউএই। তেহরান, কোম ও অন্যান্য স্থানে ছয় দিনের অনুষ্ঠান শেষে মাশহাদের ইমাম রেজা মাজারে খামেনিকে দাফন করা হয়। সৌদি আরবকে এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো না হলেও তারা উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছিল।
এমবিএস বনাম এমবিজেডের এই বিরোধ কোন দিকে মোড় নেবে? উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, জিসিসির দুই বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ও সবচেয়ে জনবহুল দেশ দুটির মধ্যে উত্তেজনা কিন্তু তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কে ভাঙন ধরার আগে থেকেই ছিল। যেমন, ২০০৯ সালে জিসিসির সদর দপ্তর আবুধাবির পরিবর্তে রিয়াদে করার পরিকল্পনার প্রতিবাদে উপসাগরীয় মুদ্রা ইউনিয়ন প্রকল্প থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল ইউএই।
বর্তমানে এই দুই নেতা তাদের অর্থনৈতিক শক্তি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। উভয়েই মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যতের প্রধান রূপকার হতে চান।
এখন প্রশ্ন হলো, এই অঞ্চলের অভিভাবক হিসেবে নিজেদের মনে করা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা কী করবে? তারা কি দুই দেশকে এক সুতোয় বাঁধতে বাধ্য করবে, নাকি ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতিতে চালিয়ে দেখবে যে কে পশ্চিমাদের বেশি সুবিধা দিতে পারে? এমন পরিস্থিতিতে চীন এবং সম্ভবত রাশিয়া কি এই দ্বন্দ্বে জড়িয়ে সুযোগ নেবে? এই লড়াইয়ে অনেক কিছু নির্ভর করছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের ওপর ভিত্তি করে ডলারের আধিপত্যও ঝুঁকিতে পড়তে পারে, যা চীনা মুদ্রা ইউয়ানের উত্থানের পথ প্রশস্ত করতে পারে।
আপাতত কে জয়ী হবেন, তা বলা কঠিন। তবে এই উত্তেজনা যদি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বে রূপ নেয়, তবে কোনো শাসকই লাভবান হবেন না।





