ইরান সংকটে চীনের কৌশল, বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক জ্বালানি সমীকরণ

চীনের চিংদাও বন্দরের অপরিশোধিত তেল টার্মিনালে আমদানি করা অপরিশোধিত তেল খালাস করছে অয়েল ট্যাংকার
চীনের চিংদাও বন্দরের অপরিশোধিত তেল টার্মিনালে আমদানি করা অপরিশোধিত তেল খালাস করছে অয়েল ট্যাংকার | ছবি: সংগৃহীত
0

ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতিতে চীনের অবস্থান নিয়ে নতুন হিসাব কষার সুযোগ তৈরি করেছে। সরবরাহ ব্যাহত হলে বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে চীন বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে এমন ধারণা ছিল। কিন্তু বেইজিং কৌশলগত মজুত, আমদানি কমানো, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানো এবং জ্বালানি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা থেকে রক্ষা করার সক্ষমতা দেখিয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, চীন শুধু তেলের বড় ক্রেতা নয়; প্রয়োজনে বৈশ্বিক সরবরাহ ও দামের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। মডার্ন ডিপ্লোম্যাসির সাম্প্রতিক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বাজারকে চমকে দেয়া সিদ্ধান্ত
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে সংঘাত শুরুর পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়। বাজারে ধারণা ছিল, বিকল্প উৎসের জন্য চীন তীব্র প্রতিযোগিতায় নামবে। কিন্তু বেইজিং উল্টো পথে হাঁটে।

চীন হঠাৎ করেই অপরিশোধিত তেল আমদানি কমিয়ে দেয়। বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা কৌশলগত মজুত ব্যবহার করে শোধনাগারের কার্যক্রম কমানো হয় এবং দেশীয় সরবরাহ নিশ্চিত করতে পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানিও সীমিত করা হয়। মধ্যপ্রাচ্য থেকে রপ্তানি কমে যাওয়ার সময় চীনের চাহিদা কমে যাওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে চাপ কিছুটা হালকা হয়।

ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭২ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ১১৮ ডলারে উঠেছিল। পরে চীনের আমদানি কমার প্রভাব বাজারে প্রতিফলিত হলে দাম কিছুটা নেমে আসে।

দীর্ঘ প্রস্তুতির ফল
চীনের এই পদক্ষেপ তাৎক্ষণিক নয়। বহু বছর ধরে জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেশটি অপরিশোধিত তেল সংরক্ষণ সক্ষমতা ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। বর্তমানে তাদের মজুতের পরিমাণ ১৩০ থেকে ১৫০ কোটি ব্যারেলের মধ্যে বলে ধারণা করা হয়, যা গড় আমদানির হিসেবে ১০০ দিনের বেশি চাহিদা মেটাতে সক্ষম।

এছাড়া দেশীয় উৎপাদন বাড়িয়ে দৈনিক ৪৩ লাখ ব্যারেলের রেকর্ডে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমানোর চেষ্টা চলছে।

সংকটে আমদানি কমেছে
সংকটকালে চীনের অপরিশোধিত তেল আমদানি দ্রুত কমে যায়। জুন মাসে আমদানি আগের বছরের তুলনায় ৪১ শতাংশের বেশি কমে দৈনিক ৭১ লাখ ২০ হাজার ব্যারেলে নেমে আসে, যা ২০১৬ সালের পর সর্বনিম্ন।

এর আগে ২০২৫ সালে চীন দৈনিক ১ কোটি ১৫ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল তেল আমদানি করেছিল, যা বৈশ্বিক চাহিদার প্রায় ১৬ শতাংশ। সরবরাহ সংকটে প্রতিযোগিতায় নামার বদলে বেইজিং মজুতের ওপর নির্ভর করে কেনাকাটা কমিয়ে দেয়। রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, মজুত থেকে উত্তোলন তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল, অর্থাৎ ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় চীনের হাতে এখনো বড় সঞ্চয় রয়েছে।

রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের প্রভাব
চীন সাময়িকভাবে পেট্রোল, ডিজেল ও জেট জ্বালানিসহ পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি সীমিত করে। এতে দেশীয় বাজার স্থিতিশীল থাকলেও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ঘাটতি দেখা দেয়। অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো অতিরিক্ত চাপে পড়ে। জুলাইয়ে কিছুটা শিথিল করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আঞ্চলিক জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব ফেলতে পারে—এটি স্পষ্ট হয়।

ক্রেতা থেকে প্রভাবক
দীর্ঘদিন ধরে চীনকে তেলের বাজারে বড় ক্রেতা হিসেবে দেখা হতো, যার চাহিদা দামে প্রভাব ফেললেও সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা সীমিত ছিল। ইরান সংকট দেখিয়েছে, আমদানি, শোধনাগার কার্যক্রম, মজুত ব্যবহার ও জ্বালানি রপ্তানি—সব মিলিয়ে চীন সরাসরি বাজারের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।

এতে সৌদি আরব, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান জ্বালানি শক্তির পাশাপাশি চীনও দামের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় উঠে আসছে।

স্বচ্ছতার প্রশ্ন
তবে চীনের জ্বালানি মজুত নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। কৌশলগত মজুত বা মজুতের ওঠানামা সম্পর্কে বেইজিং খুব কম তথ্য প্রকাশ করে। ফলে আমদানি, উৎপাদন ও শোধনাগারের উপাত্ত বিশ্লেষণ করেই বাজারকে অনুমান করতে হয়। ভবিষ্যৎ কোনো সংকটে এই তথ্য ঘাটতি বাজারে অস্থিরতা বাড়াতে পারে।

বিশ্লেষণ
ইরান সংকট মোকাবিলায় চীনের পদক্ষেপ বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতিতে একটি মোড় ঘোরানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। সামরিক বা কূটনৈতিক শক্তির বাইরে কৌশলগত জ্বালানি ব্যবস্থাপনাও যে ভূরাজনৈতিক প্রভাবের হাতিয়ার হতে পারে, তা স্পষ্ট হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে গড়ে তোলা মজুত, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের বিস্তার চীনকে এমন বিকল্প দিয়েছে, যা বড় সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার সময়ও তাকে স্থিতিশীল থাকতে সাহায্য করছে।

এতে ভবিষ্যতে জ্বালানি উৎপাদক ও ভোক্তা উভয় পক্ষের কৌশলগত হিসাব বদলে যেতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এত দিন চীনের আমদানিনির্ভরতা বড় দুর্বলতা বলে ধরে নিয়েছিল। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই ধারণায় নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

এএম