এদিকে বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানে নতুন এক দফা হামলা চালিয়েছে মার্কিন সেনাবাহিনী। এটি টানা ১২তম রাতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা। এর জবাবে ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়েছে। ইরান জানিয়েছে, তারা জর্ডানে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, অস্ত্র ও জ্বালানি মজুতাগারে হামলা করেছে। এ ছাড়া কুয়েতে আল-আদিরি ক্যাম্প, আলী আল সালেম বিমানঘাঁটি, দোহা ক্যাম্প এবং আরিফজান ক্যাম্পসহ মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতেও তারা আঘাত হেনেছে।
লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে নতুন হুমকির আগেই ইরানের হরমুজ প্রণালি প্রায় পুরোপুরি অবরুদ্ধ করার ফলে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এতে তেলের দাম বেড়ে গেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিন ব্যবহারকারীরা চাপে পড়েছেন। এই অজনপ্রিয় যুদ্ধ আসন্ন নভেম্বরের কংগ্রেসনাল নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের রিপাবলিকান মিত্রদের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
আরব উপদ্বীপের যে প্রান্তে হরমুজ প্রণালি অবস্থিত, তার বিপরীত প্রান্তে বাব-এল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে ইয়েমেনভিত্তিক হুতি যোদ্ধারা। সোমবার তারা সৌদি আরবের ওপর নৌ অবরোধ ঘোষণা করে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, এটি দর কষাকষির সুযোগ তৈরির জন্য ইরানের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।
বাব-এল-মান্দেব প্রণালি এড়াতে বুধবার লোহিত সাগরে পাঁচটি ট্যাংকার তাদের যাত্রাপথ বদল করেছে। এর আগে মঙ্গলবার চীন ও ভারতের উদ্দেশে যাওয়া সৌদি তেলবাহী তিনটি ট্যাংকার ইউ-টার্ন নিয়েছিল।
হুতিরা জানিয়েছে, তাদের বাহিনী লোহিত সাগরে দুটি সৌদি তেল ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ট্যাংকার দুটি হলো ‘এনসেলিয়া’ ও ‘লায়লা’। সৌদি সরকারি সংবাদ সংস্থা এসপিএ এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, এনসেলিয়ায় আঘাত হানার ফলে ট্যাংকারটির সামনের অংশে আগুন ধরে যায়। তবে লায়লায় হামলার ঘটনা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
সামুদ্রিক নিরাপত্তার একটি সূত্র জানিয়েছে, বুধবার রাতে এনসেলিয়া থেকে একটি বিপৎসংকেত পাঠানো হয়। বার্তায় বলা হয়, লোহিত সাগরের সৌদি বন্দর জিজানের কাছে ট্যাংকারটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতের শিকার হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি এড়াতে সৌদি আরবের দৈনিক লাখ লাখ ব্যারেল তেল দেশটির লোহিত সাগরীয় বন্দর ইয়ানবুতে নেয়া হচ্ছিল। এখন লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে সুয়েজ খাল হয়ে উত্তরের পথই একমাত্র উপায় থাকবে। এতে যাত্রার সময় ও খরচ কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত বেড়ে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা বলেছেন, সৌদি আরবের ওপর হুতিদের নৌ অবরোধ আরোপের হুমকি এই যুদ্ধকে অনেকটাই বিস্তৃত করে তুলতে পারে এবং মার্কিন সেনাবাহিনীর ওপর চাপ ফেলবে।
জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, ৪০ লাখ ব্যারেল সৌদি তেল বহনকারী চীনের দুটি অতি-বৃহৎ অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ বৃহস্পতিবার বাব-এল-মান্দেব প্রণালির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি ট্রাম্পের
লোহিত সাগরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আগে বুধবার ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরান কোনো জাহাজে গুলি চালালে প্রতিবারই তিনি ইরানের একটি সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করবেন। পাল্টা জবাবে ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড সতর্ক করে দিয়েছে, অবকাঠামোর বিরুদ্ধে ট্রাম্পের এই হুমকি বাস্তবায়ন করা হলে ইরানি বাহিনী আঞ্চলিক তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করবে। ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান ‘এক ফোঁটা তেলও’ রপ্তানি হতে দেবে না।
এর কয়েক ঘণ্টা পর ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানায়, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণে ‘মাইন পাতা’ একটি রুটে বিস্ফোরণ ঘটেছে। এতে তিনটি তেল ট্যাংকারের একটিতে আগুন ধরে যায় এবং বাকি দুটি ফিরে যায়। বিপ্লবী গার্ড জানিয়েছে, প্রণালিটি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ‘পুরোপুরি বন্ধ’। ইরানের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া কোনো ট্যাংকারকে প্রবেশ বা বের হতে দেয়া হবে না বলে সতর্ক করেছে তারা।
জুনের যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে টানা ১২ দিনের হামলায় দক্ষিণাঞ্চল থেকে বিস্তৃত হয়ে ইরানের পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে মার্কিন হামলা। মার্কিন সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, জাহাজ চলাচলে হুমকি সৃষ্টির ইরানের সক্ষমতা ‘আরও দুর্বল’ করার প্রক্রিয়া তারা অব্যাহত রাখবে।
ইরানি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র দুইবার বুশেহরে একটি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। বুশেহরে দেশটির একমাত্র বাণিজ্যিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ চুল্লি চালু রয়েছে। দুই দিনের মধ্যে সেখানে এটি তৃতীয় হামলার ঘটনা।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাকের সঙ্গে সীমান্ত পারাপারের স্থান শালামচেহতে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুজন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন। খুজেস্তান প্রদেশের এক কর্মকর্তা এ কথা জানিয়েছেন।
সামরিকভাবে ইরানকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে বলে ওয়াশিংটনের দাবি সত্ত্বেও তেহরান দেখিয়ে দিয়েছে যে, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা তারা এখনো ধরে রেখেছে। এই সপ্তাহে ইরান কুয়েতের গুরুত্বপূর্ণ পানি পরিশোধন কেন্দ্র ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানে মার্কিন সামরিক স্থাপনায়ও আঘাত হেনেছে দেশটি।
দুই পক্ষই প্রাণহানি বেড়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত মাসের শেষ থেকে এখন পর্যন্ত ৫৩ জন বেসামরিক মানুষ নিহত ও ৫৯২ জন আহত হয়েছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা শুরুর পর থেকে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
মার্কিন সেনাবাহিনী বলেছে, তারা কখনোই বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে না। যুদ্ধকালীন মানবিক আচরণের বিষয়ে ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশন এমন হামলা লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে ট্রাম্প বারবার বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলার হুমকি দিয়ে আসছেন। সামরিক কাজে ব্যবহৃত হলে এবং বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি অতিরিক্ত না হলে বেসামরিক অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করা যেতে পারে বলে বিধান রয়েছে।
এই যুদ্ধে ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৪৫০ জনের বেশি সেনা আহত হয়েছেন। গত কয়েক দিনে সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় নিহত চার মার্কিন সেনার মরদেহ গ্রহণের এক অনুষ্ঠানে বুধবার ডেলাওয়্যারের ডোভার বিমানঘাঁটিতে যোগ দেন ট্রাম্প। নিহতদের তিনজন মারা যান জর্ডানে এবং একজন ইরাকে।
অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে ট্রাম্প বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট হিসেবে এটি আমার সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। কিন্তু এটি করতে হবে।’ পরে জর্জিয়ায় দেয়া এক বক্তব্যে ট্রাম্প ভিন্ন সুরে যুদ্ধকে ‘সামান্য একটা সংঘর্ষ’ বলে অভিহিত করেন।





