ক্ষমতায় বসেই বড় সিদ্ধান্ত: উত্তর সাগরে তেল-গ্যাস তোলার পথে ব্রিটেন

অ্যান্ডি বার্নহাম
অ্যান্ডি বার্নহাম | ছবি: সংগৃহীত
0

আগামী সোমবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পরপরই উত্তর সাগরে নতুন করে তেল ও গ্যাস উত্তোলনের পরিকল্পনা ঘোষণা করতে যাচ্ছেন অ্যান্ডি বার্নহাম। বিবিসির প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

২০২৪ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে লেবার পার্টি নতুন কোনো লাইসেন্স না দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে বিদ্যমান লাইসেন্সগুলো বহাল রাখার কথা বলেছিল। নতুন এই দলপ্রধান জানিয়েছিলেন, তিনি সেই ইশতেহারই অনুসরণ করবেন। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে স্কটল্যান্ডের রোজব্যাংক ও জ্যাকডো নামের দুটি তেল ও গ্যাস ক্ষেত্র। ২০২২ ও ২০২৩ সালে তৎকালীন কনজারভেটিভ সরকারের অধীনে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এগুলো অনুমোদন দিয়েছিল। তবে ২০২৫ সালে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল হয়ে যায়।

এই ঘোষণাটি বার্নহামের একগুচ্ছ পদক্ষেপের অংশ। এর মধ্যে রয়েছে পানি ও জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনার পরিকল্পনা এবং নতুন কাউন্সিল হাউস নির্মাণ কর্মসূচি। তিনি নতুন কিছু পদক্ষেপের রূপরেখাও দিতে পারেন, যা ‘জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষকে কিছুটা স্বস্তি’ দেবে। এছাড়া ‘যত দ্রুত সম্ভব মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে একটি সক্রিয় সূচনা’ করার ইচ্ছাও রয়েছে তার।

তেল ও গ্যাসের নতুন এই পরিকল্পনার বিস্তারিত এখনো স্পষ্ট নয়। তবে উত্তর সাগরের এই বিরোধ দীর্ঘদিনের। খনন কাজে বিরোধিতা করার জন্য কিয়ার স্টারমার সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, নতুন লাইসেন্স ভোক্তাদের জন্য সস্তা বিলের নিশ্চয়তা দেয় না। ভবিষ্যতে নিরাপদ জ্বালানি সরবরাহের জন্য নবায়নযোগ্য উৎসে রূপান্তর করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি জানান।

কনজারভেটিভ ও রিফর্ম ইউকে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীর ওপর আরও খনন কাজের অনুমোদন দিতে চাপ সৃষ্টি করেছিল। তাদের ভাষ্য, ইরান যুদ্ধে যখন জ্বালানির দাম বেড়েছে, তখন দেশ নিজের সম্পদ ব্যবহার না করাটা ‘বেপরোয়া’ সিদ্ধান্ত।কিয়ারের এই পদ্ধতির সমালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। তিনি বারবার ‘উত্তর সাগরের তেল উন্মুক্ত করার’ আহ্বান জানিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের আগে সামাজিক মাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে তিনি বলেছিলেন, স্টারমার জ্বালানি নীতিতে ‘চরমভাবে ব্যর্থ’ হয়েছেন।

কিয়ার নিজের দলের মধ্য থেকেও এই বিতর্ক ক্রমেই বিভাজন সৃষ্টি করতে দেখেছেন। জ্বালানি নীতি নিয়ে দলের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন লেবারের অনেক ব্যক্তিত্ব। লেবারের কিছু সংসদ সদস্য সরকারকে আরও উদার নীতি নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের সতর্কবার্তা, তেল ও গ্যাস থেকে দূরে সরে আসার প্রক্রিয়ায় অবশ্যই কর্মসংস্থান এবং জ্বালানি বিলের ব্যয় রক্ষা করতে হবে।

তবে অন্যরা সরকারের বিদ্যমান পদ্ধতিকে সমর্থন করেছেন। তাদের যুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা উন্নত করতে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ অপরিহার্য। বর্তমান জ্বালানি সচিব এড মিলিব্যান্ড লেবারের ইশতেহারের অবস্থানের কট্টর সমর্থক। বার্নহামের অধীনে তার মন্ত্রিসভার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে তিনি রোজব্যাংককে দেয়া লাইসেন্সকে ‘জলবায়ু ধ্বংসযজ্ঞ’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে দলের নেতৃত্বের মনোনয়নের সময়সীমার আগে তেল ও গ্যাস শিল্প এবং ট্রেড ইউনিয়নগুলো বার্নহাম ও অন্যান্য লেবার সংসদ সদস্যদের কাছে একটি চিঠি পাঠায়। চিঠিতে ‘উত্তর সাগরের তেল ও গ্যাসকে সমর্থন’ করার আহ্বান জানানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, তেল ও গ্যাস শিল্পকে সমর্থন করা মানে হলো ‘দেশ উৎপাদন, নির্মাণ এবং উৎপাদন খাতে অঙ্গীকারবদ্ধ রয়েছে বলে একটি সংকেত দেয়া।’

চিঠিতে আরও যোগ করা হয়, ‘এটি একটি সংকেত যে, সরকার সেই মানুষ ও জায়গাগুলোকে সমর্থন করে, যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই দেশকে শক্তি জুগিয়েছে।’ এক মাস আগে উপ-নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে ফেরা বার্নহাম চলতি সপ্তাহের শুরুতে ৩৭৯ জন লেবার সংসদ সদস্য এবং দলের সঙ্গে সংযুক্ত ১১টি ট্রেড ইউনিয়নের সমর্থন পেয়ে দলের একমাত্র নেতৃত্বের প্রার্থী হিসেবে আবির্ভূত হন।

নতুন এই লেবার নেতা জানিয়েছেন, সোমবার কিয়ারের কাছ থেকে দায়িত্ব নেয়ার আগেই তিনি তার মন্ত্রিসভা চূড়ান্ত করছেন। বার্নহামের মন্ত্রিসভার শীর্ষ পদগুলোতে কারা থাকবেন, তা নিয়ে জল্পনা বাড়ছে। রেচেল রিভসের স্থলাভিষিক্ত হয়ে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পেতে পারেন মিলিব্যান্ড অথবা শাবানা মাহমুদ।

তার শীর্ষ দল ঘোষণা কেন করেননি—এমন প্রশ্নের জবাবে শুক্রবার নতুন এই লেবার নেতা বলেন, ‘পদ গ্রহণের আগেই যদি অর্ধেক রদবদল শুরু করা হয়, তবে সেটি সময়ের আগেই করা হবে এবং আমার মনে হয়, এটি সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে।’ এর আগে সেদিনই দলের সমর্থন পাওয়ার পর প্রথম বক্তব্যে বার্নহাম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার একটি ‘পরিকল্পনা’ আছে। তিনি নিজের নেতৃত্বে ‘আশা ফিরিয়ে আনার’ অঙ্গীকার করেন।

সেই ভাষণে বার্নহামের নীতি কর্মসূচির প্রথম আভাসও পাওয়া যায়। এতে নতুন কাউন্সিল হাউস, প্রধান বাণিজ্যিক এলাকাগুলোর পুনরুজ্জীবন এবং শিক্ষায় উন্নতির কথা রয়েছে বলে জানা গেছে। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সাবেক মেয়র বার্নহাম এর আগে সামাজিক পরিচর্যায় সংস্কার, পানি ও জ্বালানি কোম্পানিগুলোর ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি এবং হোয়াইটহল থেকে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন।

এএম