বছরখানেক আগেই পর্দা কাঁপিয়েছিল বলিউড সিনেমা 'ডঙ্কি'। উঠে এসেছিল ভাগ্য বদলের আশায় একদল বন্ধুর উন্নত দেশে যাওয়ার বিপজ্জনক যাত্রার গল্প।
বাস্তবতা আরো কঠিন। তাই তো সর্বস্ব খরচ করে মৃত্যুর ঝুঁকি মাথায় নিয়ে ভারত থেকে সুদূর যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে পারলেও শেষ পর্যন্ত স্বপ্ন ধরা দেয়নি। অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রশাসনের খড়গের নিচে চাপা পড়েছে ভবিষ্যৎ। অসাধু ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব বিকিয়ে বন-জঙ্গলে হেঁটে, সাঁতরে বিপদসংকুল দীর্ঘ যাত্রার পর যারা পৌঁছেছিলেনও, ফিরতে হচ্ছে তাদের।
অভিবাসীদের একজন বলেন, ‘ইউরোপ থেকে আমি ডঙ্কির রাস্তায় পৌঁছেছি। কথা তো ছিল আমাকে বিমান দিয়ে পৌঁছে দেয়ার। কিন্তু তারপর আমাকে ডঙ্কির রাস্তায় ফেলে দিলো। এখান থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত পৌঁছাতে ৪০ লাখের বেশি খরচ হয়েছে আমার। মাত্র ১১ দিন সেখানে থাকতে পেরেছি।’
আরেকজন বলেন, ‘ডঙ্কি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলাম। পয়সা কামাতে গিয়েছিলাম। এখানে আমাদের রোজগার নেই। সরকার আমাদের কাজ দেয় না। তাই গিয়েছিলাম। ৪০-৪৫ লাখ রুপি লেগেছিল যেতে।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবৈধ অভিবাসী গণপ্রত্যাবাসন কর্মসূচির অংশ হিসেবে শতাধিক ভারতীয়কে দেশে ফেরত পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু দাগি আসামির কায়দায় যেভাবে তাদের ফেরত পাঠাচ্ছে মার্কিন প্রশাসন, তাতে ক্ষোভ ছড়িয়েছে সর্বস্তরে। সামরিক বিমানে ৪০ ঘণ্টার নরকসম যাত্রায় ভারতীয়দের উঠিয়ে দেয়া হয় গরু-ছাগলের মতো হাত-পা বেঁধে।
অবৈধ অভিবাসীদের একজন বলেন, ‘আমাদের হাতে হাতকড়া, পায়ে বেড়ি লাগিয়ে আমাদের বললো যে আপনাদের ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু তারপর ক্যাম্পে না নিয়ে আমাদের বিমানবন্দরে নিয়ে গেলো। বললো যে ক্যাম্পে নয়, আপনারা ভারতে ফিরে যাচ্ছেন।’
অবৈধ অভিবাসীদের সাথে ট্রাম্প প্রশাসনের অমানবিক আচরণ উত্তাপ ছড়িয়েছে ভারতের রাজনীতিতে। ভারতীয় পার্লামেন্টের দু'কক্ষেই বৃহস্পতিবার (৬ ফেব্রুয়ারি) এ নিয়ে হট্টগোলের এক পর্যায়ে অধিবেশন স্থগিত হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটনের সাথে কাজ করছেন বলে উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় আইনপ্রণেতাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর বলেন, ‘ফেরত পাঠানোর সময় অভিবাসীদের সাথে যেন কোনো ধরনের অসম্মানজনক আচরণ না করা হয়, তা নিশ্চিতে আমরা অবশ্যই মার্কিন প্রশাসনের সাথে কথা বলছি। একইসাথে অবৈধ অভিবাসন খাতের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার বিষয়েও লক্ষ্য রাখছি আমরা।’
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র সফর ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাথে বৈঠকের সপ্তাহখানেক আগেই এমন ঘটনায় ক্ষুব্ধ নেতারা। পার্লামেন্টের বাইরে বিক্ষোভে যোগ দেন প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধীসহ অনেকে।
ভারতের সমাজবাদী পার্টির প্রেসিডেন্ট অভিলেশ যাদব বলেন, ‘পরিস্থিতির শিকার ভারতীয়দের দাসের মতো বেড়ি পরিয়ে অমানবিক প্রক্রিয়ায় ফেরত পাঠানো হচ্ছে। ভাবুন কী স্বপ্ন দেখিয়েছিলো যে ভারত সারা বিশ্বে নেতৃত্বে দিতে যাচ্ছে। আর যারা বিশ্বগুরু বানাচ্ছিলেন, আজ তারা সব চুপ।’
ভারতের সর্বভারতীয় মজলিশ-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন প্রেসিডেন্ট আসাদউদ্দিন ওয়াইসি বলেন, ‘বিজেপির সব নেতা যে সারাক্ষণ বলতে থাকেন, মোদিজি দেশের নাম পাল্টে দিয়েছেন, সুপারপাওয়ার হয়ে গেছে দেশ, তাহলে কী হচ্ছে এসব। এভাবে অসম্মান করে, চরম অমর্যাদার শিকার হয়ে কেন তাদের ফিরতে হচ্ছে?’
জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ভারতীয় অভিবাসীর সংখ্যা ১৫ লাখের বেশি। দেশটিতে অবৈধ অভিবাসীদের মধ্যে ভারতীয়দের সংখ্যা প্রায় সোয়া সাত লাখ, অর্থাৎ প্রতিবেশী মেক্সিকো আর এল সালভাদরের পর মার্কিন ভূখণ্ডে অনুমতি ছাড়া অভিবাসী হিসেবে বসবাসরত তৃতীয় বৃহৎ জনগোষ্ঠীটি ভারতের। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গেলো সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে ১১শ'র বেশি অবৈধ অভিবাসীকে ভারতে ফেরত পাঠায় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অবৈধ অভিবাসী প্রত্যাবাসন কর্মসূচির অংশ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রাথমিক তালিকাভুক্ত নথিবিহীন প্রায় ১৮ হাজার ভারতীয় অভিবাসী।