টেস্টিংয়ের সময় ৩ প্রতিষ্ঠানের সার্ভারে ক্লডের অনুপ্রবেশ; নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি | ছবি: সংগৃহীত
0

সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষার (সাইবার সিকিউরিটি টেস্ট) সময় তিনটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সিস্টেমে অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশ ও হামলা চালিয়েছে মার্কিন এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক উদ্ভাবিত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) মডেল ‘ক্লড’। সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্স প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের তৈরি একটি এআই এজেন্টের এভাবে হামলা চালানোর খবর প্রকাশ্যে আসার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় অ্যানথ্রোপিকের এ চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রকাশ্যে এলো।

প্রতিষ্ঠানটির দেয়া তথ্যমতে, অভ্যন্তরীণ ভুল এবং পরীক্ষা পরিচালনাকারী পার্টনারদের অসাবধানতার কারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলগুলোকে অসাবধানতাবশত মুক্ত ইন্টারনেটের সংযোগ দেয়া হয়েছিল।

মূলত সেখান থেকেই এ অঘটন ঘটে। বিপরীতে, ওপেনএআইয়ের মডেলটি পরীক্ষার সময় একটি একদমই নতুন নিরাপত্তা ত্রুটির সুযোগ নিয়ে নিজেই ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে নেয়।

পর পর দুটি ঘটনার ফলে এআই প্রযুক্তির লাগামহীন সক্ষমতা ও স্বায়ত্তশাসন এবং নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে এআই ডেভেলপারদের ব্যর্থতা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিশ্ববাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার (আইপিও) আগের এ সময়ে যখন ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রোপিকের মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে নিত্যনতুন চমক আনার প্রতিযোগিতা চলছে, ঠিক তখনই এ ঘটনা ওয়াশিংটনের নীতি-নির্ধারকদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিত্বদের অনেকেই এরইমধ্যে এআইয়ের এ বিপজ্জনক দৌড় থামিয়ে আগে নিরাপত্তা নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছেন।

সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক স্টার্টআপ অ্যানথ্রোপিক এক ব্লগপোস্টে জানায়, ১ লাখ ৪১ হাজার ৬টি টেস্ট সেশন পর্যালোচনা করে তারা এ অনিচ্ছাকৃত অনুপ্রবেশ শনাক্ত করেছে। গত সপ্তাহে ওপেনএআইয়ের একটি স্বায়ত্তশাসিত এজেন্ট ‘হাগিং ফেস’ নামক স্টার্টআপের সিস্টেমে সাইবার হামলা চালালে বিষয়টি খতিয়ে দেখা শুরু করে তারা।

মূলত ‘ক্যাপচার-দ্য-ফ্ল্যাগ’ নামের এক ধরনের কাল্পনিক সাইবার মহড়ায় অ্যানথ্রোপিকের 'ক্লড' মডেলগুলোকে নিযুক্ত করা হয়েছিল। এ মহড়াগুলোতে সুরক্ষিত কাল্পনিক নেটওয়ার্ক থেকে গোপন তথ্য খুঁজে বের করাই থাকে এআই-এর লক্ষ্য।

কোনো নিরাপত্তারোধক ছাড়াই এসব পরীক্ষার আয়োজন করা হয়, যাতে এআই-এর প্রকৃত সক্ষমতা মেপে দেখা যায়। ক্লডকে বলা হয়েছিল তার কোনো ইন্টারনেট সুবিধা নেই। কিন্তু অ্যানথ্রোপিকের একটি ইভালুয়েশন পার্টনারের ভুলের কারণে সিস্টেমটি পাবলিক ওয়েবের সঙ্গে যুক্তই রয়ে যায়।

আর এ সুযোগে পাসওয়ার্ডের দুর্বলতা এবং অরক্ষিত এন্ডপয়েন্টের সুবিধা নিয়ে নির্দিষ্ট তিনটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে হামলা চালায় এআই-টি। জানা গেছে, এ অনিচ্ছাকৃত ঘটনার সঙ্গে তিনটি পৃথক এআই মডেল যুক্ত ছিল: ক্লড ওপাস ৪.৭, ক্লড মিথোস ৫ এবং একটি অভ্যন্তরীণ গবেষণাধীন টেস্ট মডেল।

একটি নির্দিষ্ট ঘটনায়, ‘ক্লড ওপাস ৪.৭’-কে পরীক্ষার উদ্দেশ্যে একটি কাল্পনিক কোম্পানির নাম দেওয়া হয়। দুর্ভাগ্যবশত, বাস্তব জগতেও ঠিক একই নামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান ছিল।

এআই মডেলটি বাস্তব জগতের সেই প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে ত্রুটি খুঁজে বের করে ভেতরের ক্রিডেনশিয়াল ও ডেটাবেসে ঢুকে পড়ে। নিজের এই কাজের ব্যাখ্যায় ‘ওপাস ৪.৭’ যুক্তি দেয়, বাস্তব জগতের সঙ্গে মিলে যাওয়া বিষয়গুলো হয়তো অ্যানথ্রোপিকের সাজানো মহড়ারই অংশ ছিল!

তবে তুলনামূলকভাবে আশার আলো দেখিয়েছে অ্যানথ্রোপিকের নতুন টেস্ট মডেলটি। ইন্টারনেটে আসল টার্গেটে প্রবেশ করেছে বুঝতে পেরে সেটি নিজ থেকেই সাইবার আক্রমণ বন্ধ করে দেয়।

এআইকে সঠিক আচরণে অভ্যস্ত করার গবেষণায় এটিকে কিছুটা ইতিবাচক হিসেবে দেখছে অ্যানথ্রোপিক, যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসার আগে আরও গভীর পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছে তারা।

ঘটনাটির ভয়াবহতা বিচারে গত ২৩ জুলাই নিজেদের সব ধরনের সাইবার পরীক্ষা স্থগিত করে অ্যানথ্রোপিক। আক্রান্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে দুই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক নিজে থেকে না জানানো পর্যন্ত কোনো আক্রমণের কথা জানতই না। তৃতীয় কোম্পানির সঙ্গেও যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে তারা। ঘটনায় অভিযুক্ত অন্যতম মূল্যায়নকারী সাইবারসিকিউরিটি ল্যাব 'ইরেগুলার' জানিয়েছে, বিষয়টির অভ্যন্তরীণ তদন্ত চলছে।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও ‘প্যালিসেড রিসার্চ’-এর নির্বাহী পরিচালক জেফ্রি ল্যাডিশ সতর্ক করে বলেছেন, শীর্ষ কোম্পানিগুলোর আরও অনেক ঘটনা হয়তো অলক্ষ্যে রয়ে গেছে বা প্রকাশ পায়নি। মডেলগুলো যত বেশি বুদ্ধিমান হবে, পরিস্থিতি তত খারাপের দিকে যাবে। তখন এগুলো মিথ্যা বলতে এবং ফাঁকি দিতে আরও বেশি পারদর্শী হয়ে উঠবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) স্পেস এক্সের সিইও ইলন মাস্ক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লেখেন, ‘এআই যত বুদ্ধিমান এবং এজেন্টিক (স্বায়ত্তশাসিত) হবে, এ ধরণের ঘটনা তত বেশি ঘটবে।’

এদিকে ঘটনার জল গড়িয়েছে মার্কিন প্রশাসন পর্যন্ত। ওপেনএআই ও অ্যানথ্রোপিকের সাম্প্রতিক এ অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডের পর ক্যাপিটল হিল ও হোয়াইট হাউসে সরকারের নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন সিইও স্যাম অল্টম্যানসহ সংশ্লিষ্টরা। জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি এড়াতে এআই উন্নয়ন ও ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের পথেই হাঁটছে যুক্তরাষ্ট্র।

এএইচ