চৈনিক হাওয়ার প্রথম আলিঙ্গন কুনমিংয়ে। ফুলেল শহর। এই শহরের মানুষকে ছুঁয়ে থাকে বসন্ত। পর্যটকরাও কুনমিং আসেন বসন্তের হাওয়ায় দোল খেতে।
প্রায় এক কোটি মানুষের বাস এই শহরে। অথচ সড়কে কেউ কাউকে টপকে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেই। হর্ণ মুক্ত শহর। কুনমিংকে শান্তিনগর বলে ডাকা যায়।
এই শহরে আমাদের আসার উপলক্ষ্য বসন্ত উপভোগ নয়। গন্তব্য ফুওয়াই ইউনান হাসপাতাল। যেখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন ঢাকা থেকে আসা রোগীদের প্রথম দলের সদস্যরা।
বিশাল অবকাঠামো আর আধুনিক সরঞ্জামে সজ্জিত এই হাসপাতালটি তৈরি হয়েছে ২০১৭ সালে। জানা গেল, শুধু ২০২৪ সালেই সফলভাবে ২০ টি হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট হয়েছে চীনের সেরা আঞ্চলিক মেডিকেল সেন্টারের স্বীকৃতি পাওয়া হাসপাতালটিতে।
দেখা হলো, এখানে চিকিৎসা নিতে আসা পাবনার রিপন মিয়ার ছেলে ইয়ামিন আর কিশোরগঞ্জের সাজিদের সঙ্গে। দু'নই হার্টের সমস্যা নিয়ে এসেছে কুনমিংয়ের এই হাসপাতালে।
জানলাম, উন্নত চিকিৎসা, অতিরিক্ত ওষুধের ব্যবহার না থাকা ও চীনা নাগরিকের সমান খরচ নেয়ায় চেন্নাই, দিল্লী, বেঙ্গালুর, ব্যাংককের চেয়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমেই এখানে চিকিৎসা নিতে পারবে বাংলাদেশের রোগীরা।
হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে দিয়াঞ্চি লেক। তিনদিকেই পাহাড় ঘেরা লেকটিতে মন পড়ে আছে এখনও। চুল ছুয়ে যাওয়া পাখির উড়ান। কখনও আকাশে, কখনও জলকেলিতে ব্যস্ত তারা। পর্যটদের আনন্দ দিতেই যেন তাদের সব আয়োজন। ইউনান প্রদেশের সবচেয়ে বড় এই লেক ঘিরে ২৪০০ মিটার লম্বা হাইগেং বাধ। মনে হলো স্প্রিং সিটি কুনমিংকে আরও প্রশান্ত করেছে দিয়াঞ্চি।

দিয়াঞ্চি লেকের পাখি। ছবি: এখন টিভি
দিনের শেষ ভাগে পৌঁছালাম কুনমিং রেলস্টেশনে। যেতে হবে ইউনানেরই আরেক শহর নুজিয়াং। নুজিয়াং যেতে আমাদের পাড়ি দিতে হবে প্রায় সাড়ে ৫শ' কিলোমিটার পথ। প্রথম ৩২৮ কিলোমিটার গতির ট্রেনে ডালি। আর ডালি থেকে আরও সোয়া ২শ' কিলোমিটার সড়ক যাত্রা। রেলস্টেশনে ঢুকেই আমাদের চোখ ছানাবড়া। বিমানবন্দর থেকে কোন অংশেই কম নয় এই রেলস্টেশন।
আমাদের চোখে মুখে ২০০ কিলোমিটার গতিতে ছুটে চলা বুলেট ট্রেন ভ্রমনের দ্যুতি। চোখের পলকেই ট্রেন এলো স্টেশনে। সিট মিলিয়ে নিয়ে বসে যেতেই শুরু স্বপ্নযাত্রা। খেয়াল রাখছিলাম ট্রেনের গতি। দুশ' না ছুলেও দেড়শ' থেকে ১৯৯ এ গতির উঠানামা যেন রোমাঞ্চের জন্য জন্ম দিচ্ছিলো। গতির তাড়া আর ইউনানের সৌন্দর্য দেখেই পেরিয়ে গেলো দু'ঘন্টা। উচ্চ গতির ট্রেন এসে থামলো ডালিতে।
কুনমিং থেকে ডালির রেলস্টেশনটিও কম নয় কোনো অংশে। এখানে পর্যটকদের আনাগোনা বেশি। যদিও আমাদের ডালি দেখার সুযোগ হয়নি। তবে স্টেশন থেকে বেরিয়েই পাহাড় চোখে পড়লো তাতে ষোল আনাই উসুল ডালির সময়টুকু।
নুজিয়াং যেতে আরও দুশ' কিলোমিটার ছুটতে হবে আমাদের। প্রশস্ত সড়ক। মাইলের পর মাইলের জুড়ে টানেল। সবাই ছুটছে তবুও যেন আশ্চর্য এক নীরবতা। কারো নিশ্বাসের শব্দ টের পাবার জো নেই।

নুজিয়াংয়ে বৃষ্টি। ছবি: এখন টিভি
নুজিয়াংয়ে বৃষ্টি স্বাগত জানালো আমাদের। পাঁচ ডিগ্রী তাপমাত্রার সঙ্গে আমাদের সকাল শুরু। মিয়ানমার সীমান্ত লাগোয়া নুজিয়াং দেখে বুঝলাম ইউনান নামের স্বার্থকতা। চীনা ভাষার ইউনানের বাংলা দক্ষিণের মেঘ। সত্যিই মেঘের গর্ভেই যেন পুরো ইউনান প্রদেশ। এখানে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের বাস। যার মধ্যে তিন লাখেরও বেশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি।
ঠিক কীভাবে পাহাড়ি জনগোষ্ঠিকে দারিদ্রের অভিশাপ থেকে মুক্তি দিয়েছে চীনা সরকার? তা দেখতেই আমরা নুজিয়াং পোভার্টি রিডাকসন মিউজিয়ামে হাজির। এখানে তুলে ধরা হয়েছে কিছুদিন আগেও পাহাড়ি জাতিগোষ্টির জীবন কেমন ছিল। দীর্ঘ বিবর্তনে তারা কিভাবে মুক্তি পেয়েছে দারিদ্রের অভিশাপ থেকে।
জাদুঘর থেকে বেরিয়ে এবার আমরা পৌঁছালাম সেইসব নৃগোষ্ঠির কাছে। দেখতে চাই পুনর্বাসনে কেন্দ্রে তাদের জীবনমানে কী পরিবর্তন এসেছে। পুরো লুসুই সিটি জুড়েই গড়ে তোলা হয়েছে এই পুসর্বাসন কেন্দ্রটি। প্রবেশ করতেই ভেসে এলো একসঙ্গে অনেক মানুষের গানের আওয়াজ। শব্দের উৎস খুঁজতেই দেখি একটি স্কুল। যেখানে বৃদ্ধ নারী পুরুষ একসাথে মজা করে পড়াশুনা করছেন। শব্দের সঙ্গ মেলাচ্ছেন ছবি। লিখছেন নিজের নাম।

বয়স্করা যেখানে শিক্ষা, বিনোদন আর খেলাধুলার মাধ্যমে দিন যাপন করছেন, বিপরীতে কর্মক্ষম এবং নারীরা কুটিরশিল্পের মাধ্যমে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলছে। স্কুল থেকে বেরিয়েই চোখে পড়লো গাড়ি চালানো প্রশিক্ষণ নেবার দৃশ্য। পাহাড়ি নারীরা খুব মন দিয়ে রপ্ত করছে গাড়ি চালানোর খুটিনাটি। শিখে ফেললেই তারাও যোগ দেবে অর্থ আয়ের যাত্রায়।
এখানে আছে একটি বেজবল তৈরির কারখানা। যেখানে কাজ করছেন শতাধিক নারী। একটি বল সেলাই করলে মেলে তিন ইউয়ান। প্রতিদিন গড়ে দেড়শ' বল সেলাই করে তারা আয় করে ৪৫০ ইউয়ান। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা দাঁড়ায় প্রায় আট হাজার টাকা। এভাবেই পাহাড়ের সংগ্রাম থেকে স্বনির্ভরের খাতায় নাম লিখিয়েছে নুজিয়াংয়ের ২২ নৃ-গোষ্ঠী।
কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে পাহাড়ের বুকেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিভিন্ন কারখানা। তারই একটি এই কফি কারখানা। রুক্ষ পাহাড়কে বশে এনে চাষ করা হয় কফি। সেখান থেকেই বীজ সংগ্রহ করে চলছে এই কারখানা। বছরে দুই হাজার টন কফির বিন তৈরি করে চলেছে পাহাড়ি অধিবাসীদের দ্বারাই চালিত এই কারখানা।
নৃ-গোষ্ঠীদের জীবনমান উন্নয়নের রেশ কাটতে না কাটতেই পৌছালাম নুজিয়াং ভোকেশনাল ট্রেনিং ইন্সটিটিউটে। পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে ওঠা ক্যাম্পাস যেন ছবির মতো সুন্দর। প্রায় তিন হাজারের মতো শিক্ষার্থী এই কলেজের। একেবারে হাতে কলমে পড়াশুনা হয় এখানে। নার্সিং বিভাগটি যেমন আস্ত হাসপাতাল, তেমনি ট্যুরিজম বিভাগটি হোটেলের মতো। আবার নাটকের বিভাগটি পরোদস্তুর থিয়েটার। চা, কফি তৈরি করা থেকে পরিবেশন করার নিয়মও শেখানো হচ্ছে।

নুজিয়াং ভোকেশনাল কলেজের নাটকের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে জমে গেলো বন্ধুত্ব। তাদের সঙ্গে আমাদের যোগ দিতে আহ্বান করলো। আমরাও হয়ে গেলাম তাদের ক্ষনিকের সতীর্থ। কী ভীষণ সরল জীবন তাদের। চোখে জ্বল জ্বল করছে সুন্দর আগামী। বিদায় বেলায় সেই চোখেই মন খারাপের মেঘ। মন ভালো নেই আমাদেরও…বিদায় জানাতে হলো নুজিয়াংকে। পরের গন্তব্য সিচুয়ান…