দৃষ্টিশক্তি ফেরাতে পায়ের পেশি থেকে চোখে মাইটোকন্ড্রিয়া প্রয়োগে সাফল্য

চোখ
চোখ | ছবি: সংগৃহীত
0

মানবদেহের কোষের ‘পাওয়ার হাউস’ হিসেবে পরিচিত মাইটোকন্ড্রিয়া। এতদিন এই ক্ষুদ্র শক্তিকেন্দ্র নিয়ে গবেষণা হয়েছে মূলত পরীক্ষাগার ও প্রাণির ওপর। এবার প্রথমবারের মতো মানুষের চোখে শরীরের অন্য অঙ্গ থেকে সংগ্রহ করা মাইটোকন্ড্রিয়া প্রয়োগ করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন এক সম্ভাবনার দরজা খুলেছেন গবেষকরা।

যুক্তরাষ্ট্রের আইকান স্কুল অব মেডিসিন অ্যাট মাউন্ট সিনাইয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী ডেভিড পুট্রিনোর নেতৃত্বে ২৬ বছর বয়সী এক নারীর ওপর পরীক্ষামূলক এই চিকিৎসা প্রয়োগ করা হয়। তার উরুর পেশি থেকে মাইটোকন্ড্রিয়া সংগ্রহ করে দুই চোখে ইনজেকশনের মাধ্যমে দেয়া হয়। গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি ‘রিচার্স স্কয়ারে’ প্রকাশিত হয়েছে।

যেভাবে শুরু হলো চিকিৎসা

ওই তরুণী গুরুতর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের শিকার হওয়ার পর প্রায় ১৮ ঘণ্টা চিকিৎসা পাননি। এতে তার দুই চোখের অপটিক নার্ভে রক্ত ও অক্সিজেনের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। পরে চিকিৎসা চললেও প্রায় তিন মাস পর্যন্ত তার দৃষ্টিশক্তিতে কোনো উন্নতি হয়নি।

তবে চিকিৎসকরা দেখতে পান, চোখের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কোষ পুরোপুরি মারা যায়নি। বরং প্রচণ্ড ক্ষতির পরও সেগুলো জীবিত ছিল। এই কোষগুলোকে আবার সক্রিয় করার সম্ভাবনা থেকেই শুরু হয় নতুন চিকিৎসার চেষ্টা।

মাইটোকন্ড্রিয়া যেহেতু কোষে শক্তি উৎপাদনের প্রধান উৎস, তাই গবেষকদের ধারণা ছিল, দুর্বল হয়ে পড়া কোষে সুস্থ মাইটোকন্ড্রিয়া পৌঁছে দিতে পারলে সেগুলো আবার কার্যকর হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।

আরও পড়ুন:

পায়ের পেশি থেকে চোখে মাইটোকন্ড্রিয়া

রোগীর শরীর যাতে নতুন কোনো জৈব উপাদানকে প্রত্যাখ্যান না করে, সেজন্য তার নিজের শরীর থেকেই মাইটোকন্ড্রিয়া সংগ্রহ করা হয়।

উরুর পেশি থেকে সামান্য টিস্যু নিয়ে ল্যাবে প্রক্রিয়াজাত করে সেখান থেকে সুস্থ মাইটোকন্ড্রিয়া আলাদা করেন গবেষকরা। এরপর কালক্ষেপণ না করে সেই মাইটোকন্ড্রিয়া দুই চোখের ভিট্রিয়াস ফ্লুইডে ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়।

অর্থাৎ, শরীরের একটি অঙ্গের সুস্থ কোষীয় শক্তিকেন্দ্র নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অন্য অঙ্গের কোষকে আবার শক্তি দেয়ার চেষ্টা করা হয়।

কয়েকদিনেই মিললো পরিবর্তনের ইঙ্গিত

চিকিৎসার পরপরই রোগীর চোখে কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। এর আগে ৭১ দিনে ৪৫ বার পরীক্ষা করেও তার পিউপিলের আলোতে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। কিন্তু মাইটোকন্ড্রিয়া প্রয়োগের কয়েক দিনের মধ্যে দুই চোখের পিউপিল আলোতে সংকুচিত ও প্রসারিত হতে শুরু করে।

শুধু তাই নয়, চিকিৎসার ৩৯, ৪৪ ও ৪৫ দিনের পরীক্ষায় মস্তিষ্কের ইমেজিংয়ে দেখা যায়, চোখের রেটিনা থেকে অপটিক নার্ভ হয়ে মস্তিষ্কের ভিজ্যুয়াল কর্টেক্সে সংকেত পৌঁছানোর কিছু প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে রোগীর স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি ফিরে এসেছে। তিনি মূলত আলো ও অন্ধকারের পার্থক্য বুঝতে সক্ষম হয়েছেন। বাঁ চোখে এই প্রতিক্রিয়া প্রায় ১১ দিন এবং ডান চোখে ৩৯ দিন পর্যন্ত দেখা যায়।

মাইটোকন্ড্রিয়াল প্রতিস্থাপনের আগে মস্তিষ্ক ও চোখের ইমেজিংয়ে রোগীর অপটিক স্নায়ু এবং রেটিনাল গ্যাংলিয়ন কোষের ক্ষতি দেখা যাচ্ছে |ছবি: সংগৃহীত

স্থায়ী চিকিৎসা নাকি গবেষণা?

গবেষকদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষের চোখে এই পদ্ধতি প্রয়োগের পর বড় ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। ফলে মাইটোকন্ড্রিয়া-ভিত্তিক চিকিৎসা ভবিষ্যতে স্নায়ু ও চোখের কিছু জটিল রোগের ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় পদ্ধতি হয়ে উঠতে পারে।

তবে এটি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে। একজন রোগীর ওপর প্রয়োগের ফলাফল দিয়ে চিকিৎসাটিকে কার্যকর বা স্থায়ী সমাধান হিসেবে ঘোষণা করার সুযোগ নেই। আরও রোগীর ওপর বড় পরিসরে গবেষণা প্রয়োজন।

গবেষক ডেভিড পুট্রিনোর নেতৃত্বাধীন দল এখন মাইটোকন্ড্রিয়া একাধিকবার প্রয়োগ করা যায় কি না এবং তাতে দীর্ঘস্থায়ী সুফল পাওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়ে পরবর্তী গবেষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আরও পড়ুন:

কোষের ‘পাওয়ার হাউস’ থেকেই চিকিৎসার নতুন সম্ভাবনা

এক অঙ্গ থেকে মাইটোকন্ড্রিয়া নিয়ে অন্য অঙ্গের ক্ষতিগ্রস্ত কোষে পৌঁছে দেয়ার এই ধারণা চিকিৎসাবিজ্ঞানে একেবারেই নতুন পথের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে যেসব রোগে কোষ পুরোপুরি মারা না গিয়ে শক্তির অভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ে, সেখানে এই পদ্ধতি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে আপাতত এটিকে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেয়ার নিশ্চিত চিকিৎসা নয়, বরং সম্ভাবনাময় একটি পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন বিজ্ঞানীরা।

মানবদেহের ভেতরের এক কোষের ‘জ্বালানি’ অন্য কোষে পৌঁছে দিয়ে তাকে আবার সচল করার এই ধারণা সফল হলে ভবিষ্যতে শুধু চোখ নয়, স্নায়ুতন্ত্রের আরও নানা জটিল রোগের চিকিৎসাতেও খুলে যেতে পারে নতুন দরজা।

তথ্যসূত্র: সাইন্স অ্যালার্ট

এনএইচ