সবুজ পাতায় শ্রমিকের ঘাম; এক কাপ চায়ে কতটুকু ইনসাফ?

আন্তর্জাতিক চা দিবস

বিশ্ব চা দিবস
বিশ্ব চা দিবস | ছবি: সংগৃহীত
0

ধোঁয়া ওঠা এক কাপ গরম চা। আলতো চুমুকেই লুকিয়ে থাকে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের ক্লান্তি মুক্তির মহৌষধ। সকালের আলসেমি কাটানো থেকে শুরু করে বন্ধুদের বিকেলের জমজমাট আড্ডা; চা যেন আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ ২১ মে, আন্তর্জাতিক চা দিবস। কেবল একটি জনপ্রিয় পানীয় হিসেবেই নয়, বিশ্ব অর্থনীতি ও কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই অনন্য পাতাটির গুরুত্বকে উদযাপন করতেই বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে দিনটি।

চায়ের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। কথিত আছে, খ্রিষ্টপূর্ব ২৭২৭ অব্দে চীনের সম্রাট শেন নুংয়ের গরম পানির পাত্রে কিছু বুনো পাতা পড়ে এক অদ্ভুত পানীয়ের সৃষ্টি হয়, যা আজ বিশ্বখ্যাত ‘চা’। ১৬ শতকে পর্তুগিজ বণিকদের হাত ধরে এটি ইউরোপে পৌঁছায় এবং ১৭ শতকে ব্রিটিশদের হাত ধরে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

তবে আন্তর্জাতিক চা দিবসের মূল শিকড় প্রোথিত আছে চা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে। ১৭৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমেরিকার বোস্টন বন্দরে ব্রিটিশদের অতিরিক্ত চা-করের প্রতিবাদে ৩৪০টি চায়ের বাক্স সাগরে ফেলে দেয়া হয়েছিল, যা ‘বোস্টন টি পার্টি’ নামে পরিচিত। এই বিদ্রোহের চেতনাকে ধারণ করে ২০০৫ সালে ভারত ও শ্রীলঙ্কার শ্রমিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগে প্রথম ১৫ ডিসেম্বর বেসরকারিভাবে চা দিবস পালন শুরু হয়। পরবর্তীতে বৈশ্বিক বাণিজ্যের মৌসুম বিবেচনা করে ভারত সরকারের প্রস্তাবে ২০১৯ সালে জাতিসংঘ প্রতি বছরের ‘২১ মে’ তারিখটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আন্তর্জাতিক চা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

বিশ্ব চা দিবস |ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে চায়ের বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হয় সিলেটের মালনীছড়া চা-বাগান থেকে। বর্তমানে সিলেট, মৌলভীবাজার ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিস্তীর্ণ সবুজ বাগান আমাদের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। অথচ এই ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ির’ সংগ্রাহক যারা; সেই চাশ্রমিকরা রয়ে গেছেন সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত প্রান্তরে।

চাশ্রমিকদের ঘাম আর কষ্টে গড়া এই শিল্পে আজও একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১২০ থেকে ১৭০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। বর্তমান বাজারদরে এই সামান্য আয় দিয়ে খাদ্য, শিক্ষা বা চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ করা রীতিমতো অসম্ভব। এছাড়া, চাশিল্পের মোট শ্রমশক্তির ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই নারী। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে পাতা সংগ্রহের পাশাপাশি তাদের সামলাতে হয় সংসার ও সন্তান। অথচ অধিকাংশ বাগানে নারী শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত শৌচাগার, বিশুদ্ধ পানি বা মাতৃত্বকালীন ছুটির মতো ন্যূনতম সুবিধা নেই।

অপরাজিতা চা |ছবি: সংগৃহীত

বাগান এলাকায় ভালো মানের স্কুলের অভাব এবং চরম দারিদ্র্যের কারণে অনেক শিশুই প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি না পেরিয়েই বাগানের কাজে যোগ দিতে বাধ্য হয়। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই দারিদ্র্যের চক্রে আটকে থাকে।

পানির পর বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় পানীয় এই চা। এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর দারিদ্র্য বিমোচনের হাতিয়ার হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। পরিবেশবিদরা হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যেভাবে তাপমাত্রা বাড়ছে এবং বৃষ্টিপাতের ধরন বদলাচ্ছে, তাতে চায়ের উৎপাদন মারাত্মক হুমকির মুখে।

মসলা চা |ছবি: সংগৃহীত

আজকের এই বিশেষ দিনে চায়ের স্বাদে নিজের প্রশান্তি খোঁজার পাশাপাশি সেই চায়ের পেছনের মানুষগুলোর জীবনে স্বস্তি ও মর্যাদার আলো পৌঁছে দেয়াই হওয়া উচিত আমাদের অঙ্গীকার। ন্যায্য মজুরি, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে এই ‘সবুজ স্বর্ণ’ তার ঔজ্জ্বল্য হারাবে। চায়ের চুমুকে স্বস্তির সাথে যুক্ত হোক মানবিকতার বোধ, তবেই পূর্ণতা পাবে আন্তর্জাতিক চা দিবস।

এনএইচ