ওষুধ রপ্তানিতে সাফল্য: নতুন ওষুধের মূল্য অনুমোদনে আইনি জটিলতা

ওষুধের ফার্মেসি
ওষুধের ফার্মেসি | ছবি: এখন টিভি
1

দেশের চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ ওষুধ দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। বিশ্বের ১৪০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হওয়া এই শিল্প এখন অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত। অথচ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও আইনি জটিলতায় আটকে আছে নতুন ওষুধের মূল্য অনুমোদন। শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে আধুনিক ও কার্যকর চিকিৎসা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা।

তৈরি পোশাক শিল্পের পর দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় উৎপাদন খাত ওষুধ শিল্প। দেশের চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ পূরণ করে বিশ্বের ১৪০টিরও বেশি দেশে পৌঁছে যাচ্ছে বাংলাদেশের তৈরি ওষুধ। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি বিশ্ববাজারেও তৈরি হয়েছে আস্থার জায়গা। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালেই তৈরি হয়েছে এক বড় সংকট। কারখানায় উৎপাদন শেষ হলেও শত শত ওষুধ পৌঁছাতে পারছে না রোগীদের হাতে।

১৯৯৪ সালের ওষুধ মূল্য নির্ধারণের গ্যাজেট অনুযায়ী দেশের বাজারে মোট ১১৭ ধরনের ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করে থাকে সরকার। তবে ২০২৩ সালে এই আইন পরিবর্তন হয়ে এ তালিকা হয়ে দাঁড়ায় ৭০০-তে। কার্যত এর পর থেকে এ আইন আর আলোর মুখ দেখেনি। যার ফলে বাজারে যে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ রয়েছে, সেগুলো ওষুধের নতুন মূল্য নির্ধারণের যে তালিকা, সেই চিঠি এখনো পড়ে রয়েছে দপ্তর।

শুধু তাই নয়, এসব ওষুধের যে নতুন সংস্করণ, সেই সংস্করণও আর আসতে পারছে না বাজারে। যার ফলে রোগী ও যারা ভোক্তারা রয়েছেন, তারা উন্নত এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়া যেসব ওষুধ রয়েছে, সেসব ওষুধ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

আরও পড়ুন:

মূল্য নির্ধারণের প্রশাসনিক আইনি জটিলতা ও ক্ষমতার পালাবদলে থমকে আছে বাজারজাতকরণের অনুমোদন। বর্তমানে ৬৯টি প্রতিষ্ঠানের এক হাজার ১৪৪টি ওষুধ মূল্য নির্ধারণের অপেক্ষায় রয়েছে। যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুগছেন ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, কিডনি, হৃদরোগসহ জটিল রোগের চিকিৎসাপ্রার্থীরা।

পুরনো অনেক ওষুধের মূল্য পুনর্নির্ধারণের আবেদনও প্রায় দুই বছর ধরে ঝুলে আছে। ডলার বিনিময়ের হার বৃদ্ধি, কাঁচামাল আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও মূল্য সমন্বয় করতে পারছে না কোম্পানিগুলো। ফলে কিছু ওষুধ বাজারে টিকিয়ে রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

ইউনিমেড ইউনিহেলথ ফার্মাসিউটিক্যালসের পরিচালক নাজমুল হাসান বলেন, ‘কিছু আমাদের সিএনএস বর্তমান যুগে কোভিড পরবর্তী সময়ে নার্ভাস সিস্টেম রিলেটেড কিছু ডিজিজ বেড়েছে, সেখানেও কিছু নিউ ড্রাগ আসছে। এই ড্রাগগুলো এফিক্যাসিটা কিছুটা বেটার এবং কিছু সাইড ইফেক্ট কম থাকে। এটিই হলো ডেভেলপমেন্ট একটা।’

আরও পড়ুন:

শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যবসায়ী ক্ষতির চেয়েও চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি থেকে রোগীদের বঞ্চিত হওয়ার ক্ষতি ঢের বেশি। বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণের পর অনেক ওষুধ পেটেন্ট সুরক্ষার আওতার বাইরে চলে গেলে সেগুলো আর দেশে উৎপাদন সম্ভব হবে না। তাতে বাড়বে আমদানি ব্যয়।

বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (সেলস ও মার্কেটিং) এস এম মাহমুদুল হক পল্লব বলেন, ‘গত ইন্টেরিমের সময় যে প্রাইস নির্ধারণ করা হয়েছে, সেই যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, সেই জটিলতাটা এখনও নিরসন হয়নি। যার ফলে এটার বহু মাত্রিক অসুবিধা তৈরি হয়েছে। অনেক ইমপোর্টেড প্রোডাক্টের র মেটেরিয়াল, অ্যাক্টিভ র মেটেরিয়াল আমাদের কিন্তু ফ্যাক্টরিতে এক্সপায়ার হয়ে যাচ্ছে। কারণ নিউ প্রোডাক্টের অ্যাপ্রুভাল নাই। এখানে প্রাইস অ্যাপ্রুভাল না থাকলে আলটিমেটলি ব্যাকগ্রাউন্ডের সব কাজই স্থবির হয়ে যায়।’

এদিকে ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বলছে, সমস্যার মূল কারণ প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা। ওষুধ ও কসমেটিকস আইন-২০২৩ অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণের জন্য একাধিক কমিটির সুপারিশ প্রয়োজন। যার একটি কমিটি গঠন হলেও বাকি দু’টি কমিটি এখনো গঠনই হয়নি। এছাড়া রাজনৈতিক পট পরিবর্তনেও সংকট বেড়েছে।

আরও পড়ুন:

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মো. আকতার হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির একটি রিটের কারণে কোর্ট থেকে একটা নির্দেশনা আসে। একটা স্টে অর্ডার হয় হলো ইন্টেরিম গভমেন্ট যে গ্যাজেট প্রকাশ করেছে, সেই গ্যাজেট নিয়ে মূল্য নির্ধারণের কাজের তখন বাধাগ্রস্ত হয়। এখন আমাদের হাতে বাকি শুধু মূল্য নির্ধারণ কমিটি আর সাবকমিটি।’

তবে কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষে কয়েকদিনের মধ্যেই সব আইনি জটিলতা কাটিয়ে কমিটি গঠন করার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। তিনি এখন টেলিভিশনকে আরও বলেন, মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেলে নতুন ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করে বাজারজাত করতে আর কোনো জটিলতা থাকবে না।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘উই হ্যাভ ফর্মড আওয়ার কমিটি। যেই লিটিগেশনটা আগের গভমেন্ট আমলে ছিল, তাদের একটা মামলা ছিল, আমাদের একটা প্রজ্ঞাপন ছিল, উই আর গোয়িং টু উইথড্র দিস প্রজ্ঞাপন। তারা গোয়িং টু উইথড্র দা কেস। আমরা বসে আমাদের কমিটি করে দেয়া হয়েছে। সেখানে দুইজন পর্যবেক্ষক প্রাইভেট ফার্মাসিউটিক্যাল মেডিসিন কোম্পানিগুলির থাকবে। বসে মূল্য নির্ধারণ করা হবে।’

তিনি আরও জানান, ছয় ক্যাটাগরির জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দাম বাড়ানো হবে না। এর আগে চিকিৎসা সরঞ্জামসহ প্রায় ১২০টির বেশি পণ্যে মূল্য নির্ধারণ করে কিছু ক্ষেত্রে দাম কমিয়েছে ওষুধ প্রশাসন।

এসএস