মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদী আর বঙ্গোপসাগরের মোহনায় ভোলার অবস্থান। নদী ও সমুদ্রপথের বিস্তৃত যোগাযোগ ব্যবস্থা অর্থনীতির সম্ভাবনা তৈরি করলেও মাদক পাচারকারীদের জন্য এটি সহজ রুট।
মিয়ানমার থেকে আসা মাদক টেকনাফ, কক্সবাজার ও ভাসানচর হয়ে ভোলায় ঢোকার অভিযোগ রয়েছে। জেলার চরফ্যাশন ব্যবহৃত হচ্ছে বড় চালানের অন্যতম রুট হিসেবে। সম্প্রতি বিভিন্ন পণ্য পাচার হচ্ছে মিয়ানমারে, আর বিপরীতে ঢুকছে মাদকের বড় চালান। ভোলাকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে সেসব ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
স্থানীয়রা জানান, যারা এগুলো মাদক নিয়ে আসে বা নিয়ন্ত্রণ করে আজও তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। এমনকি মাদকের ব্যাপারে থানায় গুলির ঘটনাও ঘটেছে বলে জানান তারা। এছাড়া তাদের অভিযোগ, কোস্ট গার্ড ও নৌ-পুলিশ কিছু লোককে ধরলেও তাদের কাজ সন্তোষজনক নয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত বছরে ভোলায় মাদকের মামলা ৫৪০টি আর আটক ৭৩০ জন। উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য।
অভিযানে খুচরা বিক্রেতা ও সেবনকারী আটক হলেও বড় চক্রের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা থাকে না। রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব ও অর্থের জোরে মাদক কারবারে প্রভাবশালী চক্র জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে।
এক মাদক কারবারি জানান, এখন একেক চালানে প্রায় দেড় কোটি টাকার চালান ঢোকে।
আরও পড়ুন:
আরেকজন অভিযোগ করেন, প্রভাবশালী লোকেদের ধরা হয় না, বরং যারা অপেক্ষাকৃত দুর্বল, তাদের ধরে টাকা-পয়সা দাবি করা হয়। টাকা দিতে পারলে ছেড়ে দেয়, নয়তো প্রশাসনের হাতে তুলে দেয়। মূল ব্যবসায়ীদের ধরা হয় না; বরং তারাই ধরিয়ে দেয় আবার তারাই ছুটিয়ে আনে।
একাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করলেও নিয়মিত অভিযান ও বড় কারবারিদের বিরুদ্ধে তৎপরতা চোখে পড়ে না। যদিও নৌ পুলিশের দাবি, প্রয়োজনীয় জনবল ও পরিবহন সংকটে তাদের অভিযান ব্যাহত হচ্ছে।
ভোলার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মো. বদরুল হাসান বলেন, ‘আমরা সবকিছু মিলিয়ে আমাদের যতটুকু সামর্থ্য আছে, তার মধ্য দিয়ে আমাদের যতটুকু সম্ভব করার চেষ্টা করবো।’
ভোলার পূর্ব ইলিশা সদর নৌ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সৈয়দ আশিকুর রহমান বলেন, ‘নদী থেকে ১৫০ মিটার উঠে গেলে সেখানে আমাদের জুরিসডিকশন শেষ। তারপরও যেহেতু এটাকে মাদকের একটা ট্রানজিট পয়েন্ট বলে শুনতেছি, সেই হিসেবে আমরা তৎপরতাও বৃদ্ধি করেছি।’
তবে নিয়মিত টহল ও অভিযান অব্যহত রয়েছে বলে জানিয়েছে কোস্ট গার্ড। আর জেলা পুলিশ বলছে, শুধু বাহক নয়, বড় মাদক কারবারিদের চিহ্নিত করা, তাদের ব্যাংক হিসাব, সম্পদের তথ্য ও সংশ্লিষ্টতার তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হচ্ছে।
কোস্ট গার্ড দক্ষিণ জোনের স্টাফ অফিসার লে. কমান্ডার বিএন জামিলুর রহমান বলেন, ‘সন্দেহভাজন ফিশিং ট্রলার ও অন্যান্য জলযানে নিয়মিত তল্লাশি এবং ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।’
ভোলার পিপিএম পুলিশ সুপার মো. শহিদুল্লাহ কাওছার বলেন, ‘মাদকের সাথে জড়িত গডফাদার যারা আছে, তাদের বিরুদ্ধে মাদক মামলার পাশাপাশি, মানিলন্ডারিংয়ের মামলাও যাতে তাদের বিরুদ্ধে হয়, আমরা সেই ব্যাপারে সিআইডিকে তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে সহায়তা করছি।’
বাহক ও খুচরা বিক্রেতারা বারবার আটক হলেও বড় চালানের নেপথ্যের কারিগররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলে, নদী-সাগরঘেরা ভোলাকে মাদকের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করা কতটা সম্ভব—সেই প্রশ্নই ভোলাবাসীর।




