গল্প লেখা হয় কোন টেন্সে?

প্রতীকী
প্রতীকী | ছবি: সংগৃহীত
0

ছেলেবেলায় সত্যজিৎ রায়কে নিয়ম করে পড়তাম। পড়ার ঢংটা অবশ্য অনিয়মিত ছিল। একবার ফেলুদা সিরিজে বললেন, দেখা আর লক্ষ্য করার মধ্যে বিস্তর ফারাক। মানুষ প্রিয়কে দেখে, আর অপ্রিয়কে লক্ষ্য করে। সমালোচনার ছুতো খোঁজে। আমাদের দেশের পাঠকসমাজ অবশ্য এই সিলেবাসের বাইরে। বেচারারা রিলস দেখার ধৈর্যটুকুই রাখেন, আর গল্পের বই, শব্দগুলো তো জুজুর ব্যাপার। মা-মাসি, দাদি-নানির কাছ থেকে গল্প শোনার সময়টাও এখন রিলসের গর্ভে। একাডেমিক নম্বর জোগাড়ের দায়ে পড়ে গল্প পড়েনি, এমন কৈশোর খুঁজে পাওয়া ভার।

সম্ভবত কম পাঠকই ভাবেন, কোন কাল বা টেন্সে গল্প লেখা হয়। লেখকেরাও ভাবেন বলে মনে হয়নি। ধরনটা ভেতর থেকে আসে। গাইতে গাইতে গায়েন, লিখতে লিখতে লেখক। অনেকটা তিনশ পৃষ্ঠার বই না পড়ে, সড়কে আছাড় খেতে খেতে সাইকেল চালানো শেখার মতো। তবুও আজ কিঞ্চিৎ আলোচনা জমে যাক।

রাজার রানী চুরি হলো; প্রজাদের সামনে ঢোল পেটানো হলো; চোরকে সবাই ধরে দিলো— সাধারণ অতীত। এটাই গল্পে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত কাল। কিন্তু এই কালজ্ঞান ছাড়াও নীরবে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন অনেক লেখক। বলতে গেলে, অনেকটা প্রতিভার আলোতেই কালজ্ঞান একা একা এসে গেছে। আর এখানেই কাঠামোগত কালজ্ঞানকে ছাপিয়ে গল্পের ভাব, ভাষা ও মর্ম স্বাভাবিক মান ছাড়িয়েছে।

খুব নিম্নমানের, দায়সারা পাঠক হিসেবে সতর্ক দৃষ্টি রাখলে আমার কাছে গল্পের সঙ্গে পাঠকের দূরত্ব নির্ধারণের মানদণ্ড বলেই মনে হয় ক্রিয়াপদের কালের ব্যবহারকে। গল্প কখন ঘটেছে, সেটা জানার পাশাপাশি বোঝা যায় ঘটনা কোন দিকে যাচ্ছে।

অনেকটা কালের ব্যবহারেই পাঠক অবচেতন থেকে সচেতন মনে গল্পের ঘটনার ভেতর প্রবেশ করতে পারেন। অনেক লেখক সাধ্যমতো একটা নির্দিষ্ট কালেই লিখে গেছেন। ঘটনার উপস্থাপনরীতি সেক্ষেত্রে অনেক সময় তার দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ করে।

‘ঘর থেকে বের হলেন কবির আহমেদ। বাইরে প্রচণ্ড শীত। সুমনাকে ডেকেও পেলেন না। কেউ সাড়া দিলেন না। কোনো কথা না বলে চুপ করে মাফলার দিয়ে মুখ ঢেকে থাকলেন তিনি। একটা শেয়াল জঙ্গল থেকে উঁকি দিলেও নীরবে সরে গেলো।’

সাধারণ অতীতের কথাগুলোকে নিত্যবৃত্ত বর্তমানে লিখলে— ‘ঘর থেকে বের হয় কবির আহমেদ। বাইরে শীত। সুমনাকে ডাকলেও সাড়া নেই। বাড়তি কথা না বলে মাফলার দিয়ে মুখ ঢাকে সে। একটা শেয়াল উঁকি দিয়ে নীরবে সরে যায়।’

একটা কালের বদলে গল্পের প্রতি পাঠকের আগ্রহ বদলে যায়। সাধারণ অতীতের চেয়ে নিত্যবৃত্ত বর্তমানে লেখা গল্প পাঠক হিসেবে লেখককে গল্পের খুব কাছে নিয়ে যায়। নিজেও ঘটনার মাঝে ঢুকে যায়। গল্পের দৃষ্টিকোণ বিচার ও বিশ্লেষণ খুব সহজ হয়ে যায়। দর্শককে পাশে বসিয়ে গল্প শোনানোর এই ধরন বোধহয় আধুনিক বাংলা গল্পকারদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ধরেছিলেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ।

‘ক্ষুদ্র বৈঠকঘরে একমাত্র পিঠখাড়া চেয়ারে আসন গ্রহণ করে সালাহউদ্দিন সাহেব লাঠির মাথায় তার হাত দুটো জড়ো করেন। একটু দূরে শীতলপাটি বিছানো চৌকিতে কাদের মিঞা বসে। তার মুখে কৌতূহলের স্পর্শ। ঘরে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা বিরাজ করে।

‘অবশেষে উচ্চৈঃস্বরে গলা সাফ করে সালাহউদ্দিন সাহেব একনজর তাকান কাদেরের দিকে। তারপর অল্পক্ষণের জন্য তার চোখ ক্ষুদ্র ঘরের চতুর্দিকে ঘুরে বেড়ায়। স্বল্প বেতনের কেরানিমানুষ কাদেরের বাড়িতে সর্বত্র দারিদ্র্যের ছায়া। ঘরে আসবাব বলতে নড়বড়ে চেয়ারটি এবং চৌকিটি ছাড়া আর কিছু নেই। ছাতা-পড়া দেওয়ালে শোভার খাতিরে একটি ক্যালেন্ডার টাঙানো। তাতে নদীর বুকে রক্তিম সূর্যাস্তের ছবি। সেটি দু’বছরের পুরোনো। অপরাহ্ণের সূর্যের তির্যক আলোয় তাতে জমে থাকা ধুলা নজরে পড়ে। ওপাশে, ভেতরের দরজার কাছে মাটিতে বসে একটি বছর চারেকের মেয়ে বাটি থেকে মুড়ি খাওয়ায় রত। মুড়ি মুখে যতটা না যায়, তার চেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়ে তার চারপাশে। গায়ে তার একটি অপরিচ্ছন্ন ফ্রক। মুখেও সর্বত্র ময়লার স্পর্শ।’ (‘স্তন’, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ)

সাধারণ অতীত কালে লেখা রচনাকে শক্তিহীন ভাবার কোনো প্রয়োজন নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বেশিরভাগ সৃষ্টি সাধারণ অতীতে লেখা হলেও তার সৃষ্টির কারিশমা পাঠকচিত্তে কল্লোল তোলে। সাধারণ অতীত কেবল দূরত্ব তৈরি করে না; অনেক সময় সে দূরত্বের মধ্যেই স্মৃতি, বিষাদ ও অনিবার্যতার গভীরতা জন্ম নেয়।

অতীতের ক্রিয়াপদ ঘটনা শেষ হয়ে গেছে বলে জানায়, কিন্তু তার অভিঘাত যে শেষ হয়ে যায়নি, তা ভাষার ভেতরেই টের পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথের গল্পে এ অতীত প্রায়ই বর্তমানের মতো জীবন্ত হয়ে ওঠে। তার বর্ণনায় সময় পেছনে সরে গেলেও মানুষের আকাঙ্ক্ষা, দুঃখ ও একাকিত্ব পাঠকের একেবারে সামনে এসে দাঁড়ায়। ফলে কালের নির্বাচন হয়ে ওঠে আবহ, দৃষ্টিভঙ্গি ও মর্মের অংশ।

‘সেদিন রাত্রে আর কাহারো ঘুম হইল না; স্ত্রী-পুরুষে মিলিয়া সুবর্ণপুরী নির্মাণ করিতে লাগিলেন। তৎসম্বন্ধে মাঝে মাঝে উভয়ের মধ্যে মতভেদ এবং তর্কও উপস্থিত হইয়াছিল, কিন্তু আনন্দ-আবেগে তাহার মীমাংসা হইতে বিলম্ব হয় নাই। পরস্পর পরস্পরের খাতিরে নিজ নিজ মত কিছু পরিত্যাগ করিতে অধিক ইতস্তত করেন নাই, সে রাত্রে দাম্পত্য-একীকরণ এত ঘনীভূত হইয়া উঠিয়াছিল।

‘শ্রান্ত পৃথিবী অকাতর নিদ্রায় মগ্ন হইয়া রহিল। আপনার আত্মীয় হইতে আরম্ভ করিয়া অনন্ত আকাশের নক্ষত্র পর্যন্ত কেহই এই লাঞ্ছিত ভগ্ননিদ্র বৈদ্যনাথকে একটি কথা জিজ্ঞাসা করিল না। অনেক রাত্রে, বোধ করি কোনো স্বপ্ন হইতে জাগিয়া, বৈদ্যনাথের বড় ছেলেটি শয্যা ছাড়িয়া আস্তে আস্তে বারান্দায় আসিয়া ডাকিল, “বাবা!”’ (‘স্বর্ণমৃগ’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

এর মধ্যে আবার নতুন একটা প্রবণতা চোখে আসে— ভবিষ্যৎ কালে অতীতকে বর্ণনা করা। সত্তর-আশির দশকে ঢাকার আড্ডাশালায় বলা গল্পের মতো অনেক উদাহরণ দেয়া যায়। কথোপকথনে সংলাপের আভিজাত্য ও বিশিষ্টতার দায় থেকে সম্বোধনের পর একটা বাক্যাংশ প্রায়ই স্থান পেতো, ‘আপনি হয়তো দেখে থাকবেন…।’ এই ‘দেখে থাকা’ অতীতকেই ভবিষ্যতের অনুজ্ঞায় ব্যবহারের রীতি আমাদের সাহিত্যে খুব একটা প্রচলন পায়নি।

২০২১ সালের বইমেলায় আমারই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের গল্পের বই সংগ্রহ করেছিলাম। বইটির নাম ‘বেতালডাঙ্গার মিথ’। এ বইয়ের একটা গল্পে এরকম ব্যবহার পেলাম। ভবিষ্যৎ কালে নতুন প্রজন্মকে অতীতের গল্প শোনানো। বিস্ময়ে হাই তুলে গল্প পড়লাম, মন্দ লাগেনি। কল্পনায় অঘটিত ভবিষ্যৎকে পড়লেও অতীতে অবলোকিত ঘটনাকে সামনে আনার রীতি বেশ মুগ্ধ করলো। তবে খুঁজে খুব বেশি উদাহরণ পাইনি। কারণ, পাঠক হিসেবে আমি অলস।

ভবিষ্যৎ কালে লেখা গল্পের একটি ছোট উদাহরণ এমন হতে পারে— ‘আগামী শীতে তুমি এই শহরে ফিরবে। স্টেশনের পুরোনো ঘড়িটা পাঁচ মিনিট পিছিয়ে থাকবে। তুমি প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আমাকে খুঁজবে, যদিও জানবে শীত নিঃসঙ্গ। চায়ের দোকানদার তোমাকে বলবে, গত বছর এই সময় একজন পথিক প্রতিদিন এখানে বসে থাকতো। তুমি তার কথা শুনে হাসবে, তারপর বুঝবে, লোকটি আমিই ছিলাম। সন্ধ্যা নামার আগে তুমি নদীর দিকে হাঁটবে এবং সেতুর মাঝখানে গিয়ে হঠাৎ থেমে যাবে। তখন তোমার মনে হবে, এই পথ তুমি একবার আগেই হেঁটে গেছো।’

এখানে ভবিষ্যৎ ক্রিয়াপদ ভবিষ্যতের ভেতর থেকে অতীতের স্মৃতি, অনুপস্থিতি ও অনিবার্য পরিণতিকে দেখা যায়। ফলে পাঠক জানেন, ঘটনা এখনও ঘটেনি, কিন্তু তার আবেগ যেন এরই মধ্যেই সম্পন্ন হয়ে আছে।

এত কিছু নিয়ে যখন লিখলাম; এত না, সামান্য কয়েকটি লাইন। জানিয়ে রাখি, বাংলা ভাষার বেশিরভাগ লেখকই কোনো কাল জেনে লেখেন না। গল্পের হুক, চিন্তার ক্ষমতা আর শক্তিমত্তা নিয়ে লেখেন। আর হয়তো এভাবেই গল্পের নিজস্ব গল্পটাই কাকতালীয় থেকে যায়।

আতিক মেসবাহ লগ্ন

ষোলো দশে ছাব্বিশ

এসএইচ