দুই বছর পর সাতক্ষীরায় গুড়পুকুরের মেলা, ফিরেছে পুরোনো দিনের স্মৃতি

সাতক্ষীরায় গুড়পুকুরের মেলা
সাতক্ষীরায় গুড়পুকুরের মেলা | ছবি: সংগৃহীত
0

দীর্ঘ দুই বছর পর আবারও বসেছে সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুরের মেলা। শহরের শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে আজ (বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর) জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শুরু হয়েছে এ মেলা। উদ্বোধনের পর থেকেই মেলা প্রাঙ্গণে বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের আনাগোনা।

মেলায় বসেছে তিন শতাধিক স্টল। মিষ্টি, কাপড়, শাড়ি, মসলা, প্রসাধনসামগ্রী, আসবাব, শিশুদের খেলনা, বাঁশ-বেতের পণ্যসহ নানা সামগ্রী নিয়ে এসেছেন স্থানীয় ও বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা। রয়েছে কাঠের আসবাব, লোহার দা-বঁটি এবং শিশুদের বিনোদনের জন্য নৌকার আদলে তৈরি নাগরদোলাও।

দুই বছর পর মেলা বসায় স্বস্তি ফিরেছে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও। বাতাবি লেবুর শরবত বিক্রেতা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, প্রথম দিনেই মেলায় ভালো ভিড় হয়েছে। বাকি দিনগুলোতেও এমন উপস্থিতি থাকলে ব্যবসা ভালো হবে বলে আশা করছেন তিনি।

তবে এবারের আয়োজন প্রবীণদের মনে করিয়ে দিচ্ছে কয়েক দশক আগের সেই বড় পরিসরের গুড়পুকুরের মেলার কথা। পুরোনো সাতক্ষীরার বাসিন্দা ইদ্রিস আলীর স্মৃতিতে, একসময় মেলা কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ ছিল না; পুরো শহরজুড়েই ছড়িয়ে পড়ত।

তার ভাষায়, এখনকার মেলা অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। অথচ একসময় সাতক্ষীরা শহরজুড়েই বসত মেলার পসরা।

প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় পাকাপুল ও নিউমার্কেট এলাকা থেকে শহরের বিভিন্ন সড়ক ধরে তিন-চার কিলোমিটারজুড়ে মেলা বসত। প্রাণসায়র খাল দিয়ে নৌকায় করে আসত মাটির হাঁড়ি-পাতিলসহ নানা পণ্য। আনুষ্ঠানিকভাবে সাত দিন মেলা চললেও কাঠের খাট, পালঙ্ক, শোকেস ও আলমারির দোকান থাকত এক মাস, কখনো তারও বেশি সময়।

মুনজিতপুরের বাসিন্দা আসাদুল ইসলামের কাছেও গুড়পুকুরের মেলা ছিল বড় কেনাকাটার জায়গা। তিনি জানান, সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকার পাশাপাশি যশোর থেকেও মানুষ আসতেন সারা বছরের প্রয়োজনীয় আসবাব কিনতে। বিয়ের পর মেয়েজামাইকে দেয়ার ফার্নিচারও অনেকে এই মেলা থেকে কিনতেন।

গুড়পুকুরের মেলার বয়স নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ৩০০ থেকে ৪০০ বছরের প্রচলিত ধারণা রয়েছে। স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, সাতক্ষীরা শহরের পলাশপোল এলাকায় মনসাপূজাকে কেন্দ্র করে এ মেলার সূচনা। পরে এটি রূপ নেয় বড় লোকজ মেলায়। একসময় গ্রামীণ পণ্যের পাশাপাশি মেলায় বিক্রি হতো ইলিশ মাছ, গাছের চারা ও সুন্দরবনের গোলপাতাও।

তবে মেলার ইতিহাসে এসেছে একাধিক ছেদ। ২০০২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মেলা চলাকালে বোমা হামলায় তিনজন নিহত ও শতাধিক মানুষ আহত হন। এরপর কয়েক বছর বন্ধ ছিল মেলা। পরে ছোট পরিসরে আয়োজন শুরু হলেও আগের বিস্তৃতি ও জৌলুশ আর ফিরে আসেনি। সর্বশেষ দুই বছরও মেলা বসেনি।

সুজনের সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বোমা হামলার পর মেলার আয়োজন ও ব্যবস্থাপনায় আগের মতো ধারাবাহিকতা দেখা যায়নি। বর্তমানে মেলায় ঐতিহ্যের পাশাপাশি বাণিজ্যিক বিষয়টিও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

তারপরও সাতক্ষীরার মানুষের কাছে গুড়পুকুরের মেলা শুধু কেনাকাটার আয়োজন নয়; এটি আবেগ, ঐতিহ্য ও বহু প্রজন্মের স্মৃতির অংশ। মেলা ঘিরে জড়িয়ে আছে লোকজ সংস্কৃতি, পারিবারিক কেনাকাটা আর শৈশব-কৈশোরের অসংখ্য গল্প।

এবারের গুড়পুকুরের মেলা চলবে ১ থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত। সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মেলার আয়োজন করা হয়েছে। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড প্রতিরোধেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।


এফএস