আবারও বন্যা-ভূমিধসের কবলে ভারত ও নেপাল

আকস্মিক বন্যা-ভূমিধ্বসে বিধ্বস্ত নেপালের একটি চিত্র
আকস্মিক বন্যা-ভূমিধ্বসে বিধ্বস্ত নেপালের একটি চিত্র | ছবি: সংগৃহীত
0

বর্ষার শেষদিকে এসে আবারও প্রাণঘাতী ঝড়বৃষ্টি, বন্যা-ভূমিধসের কবলে ভারত ও নেপাল। প্রাণ গেছে কমপক্ষে ৭৬ জনের। আহত ও নিখোঁজ আর ৫৭ জন। আবহাওয়া পরিস্থিতির আরও অবনতির শঙ্কা দুই দেশেই। গঙ্গা, গান্দাক, কোশি, বাগমতী, নর্মদাসহ ভারতের প্রধান সব নদীতে পানি বিপৎসীমার ওপরে। থাইল্যান্ডেও ব্যাংকক ও সংলগ্ন প্রদেশগুলোতে চলছে বিরামহীন বৃষ্টি-বন্যা। দুইদিন ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার।

ব্যাংকক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কয়েক কিলোমিটারের মধ্যেই এমন পরিস্থিতি। প্রধান সড়কে কাঁধ ছুঁইছুঁই উচ্চতায় পৌঁছেছে পানি। তাও মুষলধারে বৃষ্টি চলছে তো চলছেই। এসবের মাঝেই হেঁটে শুকনো স্থানে পৌঁছানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা মানুষের।

৪৮ ঘণ্টায় তিনশো মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টির পর সোমবারও আবহাওয়ার উন্নতি নেই। শহরের সব খাল আর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা কানায় কানায় পূর্ণ বলে বন্যার পানি সরে যাওয়ার জন্যেও পর্যাপ্ত জায়গা নেই। ৫০ জেলার সবগুলোতে তাই জরুরি অবস্থা জারির পর, মঙ্গলবার পর্যন্ত দুদিন রাজধানী ও সংলগ্ন তিনটি প্রদেশে সরকারি চাকুরিজীবিদের জন্য বিশেষ ছুটির প্রস্তাবে অনুমোদন দেয় থাইল্যান্ডের মন্ত্রিসভা। বৃষ্টিবিরতি আর বন্যার পানি নামতে আরও দুই থেকে তিনদিন লেগে যেতে পারে বলে আভাস আবহাওয়াবিদদের।

স্থানীয়দের একজন বলেন, ‘গতকাল একদম ঘুমাতে পারিনি, কিছু খাইনি। খুব মানসিক চাপে ছিলাম- পানি না কমলে কী হতে পারে, সবকিছু নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলাম। যখনই বৃষ্টি হয়, আমি বাইরে বসে পাহারা দিই।’

বর্ষা বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে। এমন সময়েই মাত্র দু'দিনে স্বাভাবিকের চেয়ে নয়গুণের বেশি বৃষ্টির কবলে ভারতের উত্তরাঞ্চল।

শুক্রবার থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত প্রায় ৬৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ রাজ্য উত্তর প্রদেশে, যেখানে একই সময়ে গড় বৃষ্টির পরিমাণ আট মিলিমিটারের কম। টানা ভারী বৃষ্টির ফলে রাজ্যের উত্তরে বিভিন্ন নদী ফুলেফেঁপে ওঠায় ভেসে যায় বিস্তীর্ণ অঞ্চল। বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের প্রভাবে মৌসুমের শেষে এমন অস্বাভাবিক বৃষ্টি-বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হাজারের বেশি বাড়িঘর। হতাহত শতাধিক মানুষ।

স্থানীয়দের অন্য আরেকজন বলেন, ‘আমরা জানিই না কোথায় যাবো। আমাদের খাবার, পানির জন্য কোথাও কোনো ব্যবস্থা নেই।’

নদীতে আজ পানি বেড়ে গেছে। এ নিয়ে প্রশাসনের কোনো মাথাব্যথা নেই। নিরাপত্তা খুব জরুরি। এখানে কুদিয়া উপকূলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া দরকার কর্তৃপক্ষের। হঠাৎ পানি বেড়ে গেলে এখানকার বাসিন্দাদের কী অবস্থা হবে?

ভারী বৃষ্টির ফলে নদীতে পানি বাড়তে থাকায় পূর্বের ওড়িশা রাজ্যে নিম্নউপকূলীয় এলাকা থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হয়েছে ৭০ হাজারের বেশি মানুষকে। সেতু-সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত, বন্ধ রাখা হয়েছে জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র দেবকুণ্ড।

ভারতের কেন্দ্রীয় পানি কমিশনের তথ্য, সাত রাজ্যে ৩০টি নদী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে গুরুতর পরিস্থিতির আভাস মিলেছে। গঙ্গা, গান্দাক, কোশি, বাগমতী, নর্মদাসহ দেশের প্রধান সব নদীতে পানি বিপৎসীমার ওপরে।

অন্যদিকে, বিধ্বংসী বন্যায় ১ হাজার চারশোর বেশি মৃত্যু আর পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজের এক মাসের মাথায় আবারও প্রাণঘাতী বন্যার কবলে নেপাল। বৃহস্পতিবার থেকে নতুন করে বন্যা পরিস্থিতি দেখা দেয়। ৭৭ জেলার মধ্যে ৪৯টিতেই জারি রয়েছে আকস্মিক বন্যা সতর্কতা। চিতওয়ানে পানিবন্দি বিস্তীর্ণ অঞ্চল। রাহুগঙ্গা নদীতে বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ৪০ মেগাওয়াট পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প; বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন মানাং, মাস্টাংসহ বিভিন্ন জেলায়। একইসাথে অপটিক্যাল ফাইবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে টেলিযোগাযোগও। শঙ্কা রয়েছে, আবহাওয়ার আরও অবনতির।

নেপালের প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল পরিচালক প্রাসেন খাতি বলেন, ‘চলতি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর অনেকগুলোই আমাদের নিয়মিত কাজের জায়গা। এক মাস আগের মতো আমাদের কাজের এলাকার বাইরের বন্যা এটি নয়। তাই এবার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো আমাদের আওতার মধ্যে বলে কাজ করা কিছুটা সহজ হচ্ছে।’

বিশ্বের আরেক প্রান্তে, যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্ব উপকূলে শক্তিশালী নর'ইস্টার ঝড়ের প্রভাবে নিউজার্সিতেও দেখা দিয়েছে বন্যা পরিস্থিতি। ওয়াশিংটন ডিসি উপকূল থেকে বয়ে আসা ঝড়ের কারণে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় কয়েকশ' ফ্লাইট বাতিল করেছে বিভিন্ন বিমান সংস্থা। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন এক লাখের বেশি স্থাপনা। মধ্য আটলান্টিক আর নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলে ভারী বৃষ্টি, ঝড়ো বাতাস, বন্যা আর জলোচ্ছ্বাসের আভাস মার্কিন আবহাওয়া বিভাগের।

অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরে ক্যাটাগরি থ্রি হারিকেন পোলোর আঘাত থেকে বাঁচতে প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্যালিফোর্নিয়ার পশ্চিম উপকূল থেকে শুরু করে মেক্সিকো উপকূল পর্যন্ত লাখো মানুষ। রয়েছে দুইশো মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি, প্রাণঘাতী বন্যা ও ভূমিধসের আভাস।

এফএস