কিছুদিন আগেও ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বড় অংশেই ছিল হুথিবিরোধী ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্সের নিয়ন্ত্রণে। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের পুরোটাই চলে গেছে হুথিদের হাতে।
ইয়েমেনের অনুর্বর উপকূলীয় সমভূমি অঞ্চল তিহামাহ'র দক্ষিণের পুরোটাই এখন হুথিদের দখলে। আরব উপদ্বীপের পশ্চিম প্রান্ত থেকে আকাবা উপসাগর হয়ে বাব আল-মান্দেব প্রণালি পর্যন্ত বির্স্তীণ অঞ্চলজুড়ে বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির আকস্মিক এই উত্থানে হতবাক পর্যবেক্ষকরাও।
হিসাব বলছে, মাত্র চারদিনে লোহিত সাগর উপকূলের ৯০ শতাংশ, প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটার এলাকা দখল করেছে ইরান সমর্থিত বিদ্রোহীরা। অনেক বছরের মধ্যে হুথিদের সবচেয়ে বড় সামরিক সাফল্য এটি। ১২ বছরের গৃহযুদ্ধ, বিধ্বংসী সৌদি বিমান হামলা, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল আর যুক্তরাজ্যের আক্রমণ- সবকিছুর বিপরীতে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে টিকে আছে ইয়েমেনের জাইদি শিয়াদের নিয়ে গঠিত সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠীটি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শত্রুপক্ষকে একরকম বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আনসারুল্লাহ হুথিরা প্রমাণ করে দিয়েছে, অদূর ভবিষ্যতে এই শক্ত অবস্থান থেকে তাদের হঠানো সহজ হবে না।
যুক্তরাজ্য সামরিক ও নিরাপত্তা গবেষক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহমেদ আল আশওয়াল বলেন, ২০ হাজারের বেশি সেনাকে পিছু হঠতে বাধ্য করেছে হুথিরা। তাদের লক্ষ্য ছিল একটাই, বাব আল-মান্দেবে পৌঁছানো এবং সেটি দখল করা। এখন শুধু বাব আল-মান্দেব নয়, সাথে হাইস, কোকা, মাকবিনা, আল-মোখা- লোহিত সাগরের সবগুলো দ্বীপ- জুগার, ছোট হুনাইশ, বড় হুনাইশ, বাব আল-মান্দেবের কেন্দ্র বা সবচেয়ে বড় দ্বীপ পেরিম, সব দখলে নিয়েছে তারা। এটা সহজ ছিল না হুথিদের জন্য। সরকারি বাহিনীর জন্য এটা বিশাল পরাজয়।
গেলো প্রায় দুই বছরে সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন, মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় লেবাননের সশস্ত্র রাজনৈতিক সংগঠন হিজবুল্লাহ এবং অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের নেতৃত্ব গুঁড়িয়ে দেয়া- এমন নানা বিপর্যয়ের মুখে তেহরানের কথিত 'প্রতিরোধ অক্ষ' ভেঙে পড়ায়, ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের ছায়াশক্তি হিসেবে আস্থার শেষ জায়গা হুথিরা।
এমন বাস্তবতার প্রেক্ষিতে গেলো কয়েকদিনের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্বশক্তিকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে এক নতুন, অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সমন্বিত অভিযানের সাত মাসে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই বাণিজ্যিক নৌপথ- পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখে হরমুজ প্রণালি এবং লোহিত সাগর আর সুয়েজ খালের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালি প্রায় অচল করে দিয়েছে ইরান, যে কাজে প্রধান সহযোগীর ভূমিকায় হুথিরা। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের দ্বিতীয় ফ্রন্ট হয়ে উঠেছে হুথিদের উত্থান। প্রশ্ন উঠছে- হুথিদের অগ্রযাত্রা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে ইরানকে এগোতে সাহায্য করবে কি না।
দ্য আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো জেনিভার গাভিতো বলেন, আমি মনে করি পুরো বিষয়টিতে স্বায়ত্তশাসন আছে। এই ক্ষেত্রে হুথিরা নিজেদের অভ্যন্তরীণ স্বার্থ এবং সৌদি আরবের সাথে সম্পর্ক মাথায় রেখে পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু এতে সন্দেহ নেই যে এসবে ইরানও লাভবান হচ্ছে। শুধু আলোচনায় নয়, বাব আল-মান্দেবে অর্থনৈতিক বাধা আরোপের ক্ষেত্রে সুবিধা পাচ্ছে।
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রধান মিত্র সৌদি আরবও পড়েছে কঠিন পরিস্থিতিতে। সৌদি তেলবাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিকটবর্তী সব এলাকাই হুথিদের দখলে। আগে থেকেই অবরোধে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হরমুজ প্রণালিতে। সরবরাহ সংকটে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি পৌঁছেছে ১০৮ ডলারে।





