যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা; আবারও উত্তপ্ত যুদ্ধের ময়দান

ইরানের একটি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছে
ইরানের একটি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছে | ছবি: রয়টার্স
0

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হয়েছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক সংঘর্ষের পর বুধবার দুই দেশ ফের যুদ্ধের অবস্থানে ফিরেছে। যুক্তরাষ্ট্র আরও ভয়াবহ হামলার হুমকি দিয়েছে। অন্যদিকে ইরান অভিযোগ করেছে, একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলায় পাঁচজন নিহত ও কয়েক ডজন বেসামরিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, মঙ্গলবার ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোরের বিভিন্ন স্থাপনায় এক দফা হামলা চালানো হয়েছে। এসব হামলার লক্ষ্য ছিল আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, রাডার ব্যবস্থা, সামুদ্রিক সামরিক সরঞ্জাম, মাইন পাতা ও যোগাযোগের সক্ষমতা–সংশ্লিষ্ট স্থাপনা।

ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, মঙ্গলবার দেশটির বিভিন্ন এলাকায় একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হয়েছে। এর অনেকগুলো ছিল হরমুজ প্রণালির কাছে। অনুমতি ছাড়া এই সরু জলপথ দিয়ে যেসব তেলবাহী জাহাজ চলাচল করে, ইরান তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দিয়ে আসছে।

ইরানও পাল্টা হামলার কথা জানিয়েছে। দেশটির সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জর্ডান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বাহরাইনেও হামলা হয়েছে।

ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর দাবি করেছে, জর্ডানে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের বিপুলসংখ্যক সেনা নিহত হয়েছেন। তবে রয়টার্সকে যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তা বলেছেন, প্রাথমিক মূল্যায়নে কোনো হতাহতের তথ্য পাওয়া যায়নি।

জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলা করেছে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। এর মধ্যে ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করা হয়। বাকি তিনটি প্রত্যন্ত এলাকায় পড়ে। বাহরাইনও জানিয়েছে, ইরানের ছোড়া ড্রোন শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয়েছে।

ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর আরও জানিয়েছে, ইরাকের উত্তরাঞ্চলের এরবিলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন সেনা নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে তারা। তবে ইরাক বা যুক্তরাষ্ট্র কেউই এ হামলার তথ্য নিশ্চিত করেনি।

জুলাইয়ের পর এই পাল্টাপাল্টি হামলাই ছিল দুই দেশের মধ্যে প্রথম বড় ধরনের সরাসরি সংঘর্ষ। এর আগে কিছুদিন দুই পক্ষ হামলা থেকে বিরত ছিল। তবে তারা আবার আলোচনায় ফেরার ব্যাপারেও তেমন আগ্রহ দেখায়নি।

এই বিরতির সময় যুদ্ধের প্রভাব দুই দেশের ওপরই বাড়ছিল। যুদ্ধের কারণে আগে থেকেই দুর্বল ইরানের অর্থনীতি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির প্রচলিত সামরিক সক্ষমতাও কমেছে। অন্যদিকে নভেম্বরে কংগ্রেস নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বাড়তে থাকা জ্বালানির দামের চাপ সামলাতে হচ্ছে।

রয়টার্স গত মাসে জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী অত্যন্ত নির্ভুল দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের বৈশ্বিক মজুতের বড় অংশ ব্যবহার করে ফেলেছে। এতে ভবিষ্যৎ সংঘাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে সংঘাত আবার শুরু হওয়ার পর দুই পক্ষই কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘হরমুজ প্রণালির ওপর প্রায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ার কারণে এখন আমাদের অবস্থান অনেক ভালো। তারা অনিবার্য পরিণতির দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। ইরানের জনগণ কবে জেগে উঠে লড়াই করবে?’

ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের হুঁশিয়ার করে বলেছে, এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অশুভ কর্মকাণ্ড’ চলতে থাকলে আরও ব্যাপক ও ভয়াবহ জবাব দেয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করা যেকোনো দেশকে এর বিপজ্জনক পরিণতি মেনে নিতে হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

যুদ্ধের মধ্যে বেসামরিক হতাহতের অন্যতম বড় ঘটনা ঘটেছে ইরানের সিরিকের কাছে। হরমুজ প্রণালির উপকূলীয় ওই এলাকায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলায় পাঁচজন নিহত ও ৫০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইরানের রেড ক্রিসেন্ট।

ইরানের সংবাদ সংস্থা মেহর জানিয়েছে, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে চার বছর বয়সী একটি শিশুও রয়েছে। আরেক সংবাদ সংস্থা ইরনা প্রাদেশিক এক কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, আহতের সংখ্যা ৬৮। হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা এখনো কোনো মন্তব্য করেননি।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘এই নিষ্ঠুরতাকে এর আগের নৃশংস ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা থেকে আলাদা করে দেখা যায় না।’ তিনি যুদ্ধের প্রথম দিনে মিনাবের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে বিস্ফোরণের ঘটনাটিও উল্লেখ করেন। ওই ঘটনায় ১৬০ জন নিহত হয়েছিলেন বলে ইরান জানিয়েছে।

মিনাবের ওই হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। তবে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, পুরোনো লক্ষ্য নির্ধারণের তথ্য ব্যবহারের কারণে ওই হামলা হয়ে থাকতে পারে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘এই বর্বর অপরাধগুলোর’ জবাব দৃঢ়ভাবে দেয়া হবে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘যেসব সরকার ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এমন বর্বরতার সামনে নীরব থাকে বা এসব কর্মকাণ্ডকে ন্যায্যতা দেয়, তাদের বুঝতে হবে, তাদের নীরবতা নিরপেক্ষতা নয়। যারা আজ নীরব থাকবে, তারা আগামীকাল এর পরিণতি থেকে মুক্ত থাকবে না।’৩১১

এএম