রায় থেকে ফাঁসি, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আইনি ধাপগুলো কী কী?

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আইনি ধাপসমূহ
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আইনি ধাপসমূহ | ছবি : সংগৃহীত
0

বিচারিক আদালতে (Trial Court / Lower Court) কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়ার পর তা কার্যকর করার আগ পর্যন্ত বেশ কিছু জটিল ও বাধ্যতামূলক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। সংবিধান ও কারাবিধি (Constitution and Bangladesh Jail Code) মোতাবেক এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। আসামিরা চাইলে বাধ্যতামূলক ধাপগুলোর পাশাপাশি অতিরিক্ত কিছু আবেদনও করতে পারে। বাধ্যতামূলক কার্যক্রম এবং আসামির সব আবেদন চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করেই কেবল ফাঁসি কার্যকর করার আইনি বিধান রয়েছে।

বিচারিক আদালত কোনো ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিলেই তা সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর করা যায় না। একজন মানুষের জীবনের সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে আইন একাধিক স্তরে বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ রেখেছে।

বিচারিক আদালতের রায় থেকে হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স (Death Reference & High Court Appeal)

প্রথমে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, দায়রা জজ আদালত বা সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালত মামলার শুনানি শেষে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। রায় ঘোষণার পর দণ্ড অনুমোদনের জন্য সব কাগজপত্র ৩ কর্মদিবসের মধ্যে হাইকোর্টে পাঠানো হয়, যাকে বলা হয় ‘ডেথ রেফারেন্স’ (Death Reference)। এ ক্ষেত্রে আসামির কোনো আলাদা আবেদনের প্রয়োজন হয় না।

  • আসামির আপিল (CRPC Rules for Appeal): ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ৩৭১ ও ৩৭৪ ধারার বিধানমতে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিপক্ষকে ৭ (সাত) দিনের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করতে হয়।
  • হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত: আসামি আপিল না করলেও হাইকোর্ট স্বয়ং সম্পূর্ণ নথি, সাক্ষ্য-প্রমাণ, তদন্ত ও নিম্ন আদালতের রায় বিবেচনা করে রায় দেন। হাইকোর্ট চাইলে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখতে পারেন, সাজা কমিয়ে দিতে পারেন অথবা আসামিকে খালাসও দিতে পারেন।

আরও পড়ুন:

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও রিভিউ আবেদন (Appellate Division & Review Petition)

হাইকোর্ট বিভাগে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলেও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হয় না।

  • আপিল বিভাগে আবেদন (Appellate Division Review): সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ মতে, সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগের অনুমোদন ছাড়া কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যায় না। আসামি কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে 'জেল আপিল' (Jail Appeal) এবং নিজস্ব আইনজীবীর মাধ্যমে 'নিয়মিত আপিল' করতে পারে। সাধারণত দুটি আপিল একসঙ্গেই শুনানি হয়।
  • রিভিউ আবেদন (Review Petition): আপিল বিভাগে আবেদন খারিজ হলে আসামি শেষ আইনি পদক্ষেপ হিসেবে 'রিভিউ' (পুনর্বিবেচনা) আবেদন করতে পারে। রিভিউ আবেদন খারিজ হলে সেই রায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, হাইকোর্ট, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, বিচারিক আদালত ও সংশ্লিষ্ট কারাগারে পাঠানো হয়।

মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিকট প্রাণভিক্ষা (Mercy Petition to the President)

সব বিচারিক প্রক্রিয়া বা আইনি সুযোগ শেষ হওয়ার পর আসামির সামনে সর্বশেষ সুযোগ থাকে সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ ও কারাবিধির (Jail Code Rule 991) ৯৯১ বিধি অনুযায়ী মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমাভিক্ষা চাওয়া।

রাষ্ট্রপতি যদি প্রাণভিক্ষার আবেদন নামঞ্জুর করেন, তবে সেই আদেশপ্রাপ্তির ২১ (একুশ) দিন থেকে ২৮ (আটাশ) দিনের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

আরও পড়ুন:

ফাঁসি কার্যকরের চূড়ান্ত প্রস্তুতি ও নিয়মাবলী (Execution Rules under Jail Code)

রাষ্ট্রপতির আদেশ সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালতে পৌঁছানোর পর ফাঁসির পরোয়ানা জারি করে তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ও কারাগারে পাঠানো হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ কারাবিধির ৯৯৯ বিধি অনুযায়ী ফাঁসি কার্যকরের দিনক্ষণ নির্ধারণ করে এবং আত্মীয়স্বজনকে শেষ দেখা করার জন্য খবর দেয়।

  • ফাঁসির সময় ও উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ: কারাবিধির ১০০০ বিধি অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড রাতের যেকোনো সময় কার্যকর করা হয়। ১০৩ বিধি অনুযায়ী ফাঁসির সময় ম্যাজিস্ট্রেট, কারা কর্তৃপক্ষ, পুলিশ ও সিভিল সার্জন (ডাক্তার) উপস্থিত থাকেন।
  • জল্লাদ ও দড়ির মাপ (Jail Code Rules for Execution): জল্লাদ (সহকারী) জেল সুপারের ইশারায় লিভার টেনে ফাঁসি কার্যকর করে। কারাবিধির ১০০৬ বিধি অনুযায়ী ২৫.৪ মিলিমিটার ব্যাসের ম্যানিলা দড়িতে ৩০ মিনিট ঝুলিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করার নিয়ম থাকলেও, ১০০৭ বিধি অনুযায়ী সাধারণত ৫ থেকে ১০ মিনিট ঝুলিয়ে রাখাই মৃত্যু নিশ্চিতের জন্য যথেষ্ট। পরবর্তীতে সুরতহাল ও পোস্টমর্টেম (Autopsy / Post-mortem) শেষে লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

কেন বছরের পর বছর আটকে থাকে মৃত্যুদণ্ডের মামলা? (Reasons for Delay in Death Reference Cases)

বাংলাদেশে বিচারিক আদালতে রায় হওয়ার পরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে দীর্ঘ সময় লাগার অন্যতম মূল কারণ উচ্চ আদালতে মামলার জট।

  • ধারাবাহিক ক্রমানুসারে শুনানি: হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল মামলাগুলো ক্রমানুসারে (Serial basis) শুনানি হয়। পুরোনো মামলার দীর্ঘ সারির কারণে নতুন ও চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর লেগে যায়।
  • বিশেষ বেঞ্চের দাবি: আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু ধর্ষণ, শিশু হত্যা ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট স্পর্শকাতর মামলাগুলোর জন্য পৃথক বিশেষ বেঞ্চ (Special High Court Bench) থাকা প্রয়োজন, যাতে দ্রুত ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়।

আরও পড়ুন:

কঠোর শাস্তি নাকি বিচারের নিশ্চয়তা? (Severity of Punishment vs Certainty of Justice)

অপরাধবিজ্ঞানী ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল শাস্তির কঠোরতা দিয়েই অপরাধ কমানো সম্ভব নয়। অপরাধী যদি মনে করে সে ধরা পড়বে না বা বিচার এড়িয়ে যাবে, তবে মৃত্যুদণ্ড ও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে না। তাই দ্রুত তদন্ত, অপরাধ সনাক্তকরণ, নিরপেক্ষ বিচার এবং সাজা কার্যকরের নিশ্চয়তা তৈরি করাই অপরাধ দমনের মূল চাবিকাঠি।

মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকরের আগে পেরোতে হয় একাধিক ধাপ; যেভাবে ফাঁসি কার্যকর হয়

একনজরে ডেথ রেফারেন্স, আপিল, রিভিউ, প্রাণভিক্ষা ও ফাঁসি কার্যকরের নিয়মাবলী

ধাপ / বিষয় (Stage / Category) আইনি প্রক্রিয়া ও বিস্তারিত নিয়মাবলী (Details)

১. ডেথ রেফারেন্স ও হাইকোর্ট

বিচারিক আদালতের রায়ের পর ৩ কর্মদিবসের মধ্যে নথি হাইকোর্টে যায়; আসামি ৭ দিনের মধ্যে আপিল করতে পারে

২. আপিল বিভাগ ও রিভিউ

সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ মতে আপিল বিভাগে জেল আপিল বা নিয়মিত আপিল ও পরবর্তীতে রিভিউ আবেদনের সুযোগ থাকে

৩. রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা

সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ ও কারাবিধির ৯৯১ বিধিমতে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা; নামঞ্জুর হলে ২১-২৮ দিনের মধ্যে ফাঁসি

৪. ফাঁসি কার্যকরের সময় ও উপস্থিত ব্যক্তি

কারাবিধির ১০০০ ও ১০৩ বিধি অনুযায়ী রাতে কার্যকর; ম্যাজিস্ট্রেট, কারা কর্তৃপক্ষ, পুলিশ ও সিভিল সার্জন উপস্থিত থাকেন

৫. দড়ি ও ঝুলিয়ে রাখার সময়

২৫.৪ মিমি ম্যানিলা দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয় (কারাবিধি ১০০৬/১০০৭ বিধি অনুযায়ী ৫-১০ মিনিটেই মৃত্যু নিশ্চিত হয়)

৬. দীর্ঘ সময় লাগার কারণ

উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্সের মামলার দীর্ঘ জট ও ক্রমানুসারে (Serial Basis) শুনানি পরিচালনা

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আইনি ধাপসমূহ (Legal Steps Before Execution of Death Sentence BD), বাংলাদেশে যেভাবে ফাঁসি কার্যকর হয় (How Hanging is Executed in Bangladesh Jail), ডেথ রেফারেন্স কি ও কীভাবে হয় (What is Death Reference in High Court BD), আপিল বিভাগ ও রিভিউ আবেদন নিয়ম (Appellate Division Review Petition Process), কারাবিধি অনুযায়ী ফাঁসি কার্যকরের সময় (Jail Code Rules for Death Penalty Execution BD), রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন (Mercy Petition to President Article 49 BD), ফাঁসির দড়ি ও জল্লাদের নিয়ম (Executioner and Rope Rules Jail Code BD), কেন ডেথ রেফারেন্স মামলা আটকে থাকে (Why Death Reference Cases are Delayed BD), ফৌজদারি কার্যবিধি ৩৭৪ ধারা (CrPC Section 374 Death Reference Rules), পোস্টমর্টেম ও লাশ হস্তান্তর নিয়ম (Post Mortem Rules After Execution BD)


এসআর