বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হোয়াইট হাউসের একটি স্মারক ও ফ্যাক্টশিটে এ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে ৬০ দিনের মধ্যে ‘ইউএসএস ডরিস মিলার’ নামে ঘোষিতব্য নির্মাণাধীন এ রণতরিতে ক্যাটাপল্ট ব্যবস্থা বসানোর একটি পরিকল্পনা জমা দিতে বলা হয়েছে। হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, এ পদক্ষেপ ‘দীর্ঘমেয়াদি জটিল সমস্যাগুলো সমাধান করবে।’ তবে নৌ-বিশেষজ্ঞরা সিএনএনকে বলেছেন, এ আকস্মিক পরিবর্তন অত্যন্ত অস্বাভাবিক।
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে নতুন বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ ইলেকট্রোম্যাগনেটিক লঞ্চিং সিস্টেম বা ‘ইএমএএলএস’ নিয়ে তৈরি। তবে দেশটির নৌবাহিনীর পুরনো ১০টি নিমিটজ-শ্রেণির রণতরিতে এখনো স্টিম-চালিত ক্যাটাপল্ট ব্যবহৃত হচ্ছে।
হাডসন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো ব্রায়ান ক্লার্ক জানিয়েছেন, এ পদক্ষেপের ফলে এরইমধ্যে নির্মাণাধীন ‘ইউএসএস ডরিস মিলারের’ নকশা নতুন করে করতে হবে। তিনি সিএনএনকে জানান, এর খরচ সম্ভবত কয়েকশ কোটি ডলারে গিয়ে দাঁড়াবে। ২০৩৪ সালের দিকে সেবায় আসার কথা থাকা এ রণতরিটির নির্মাণ ‘পরবর্তী দশকের শেষ পর্যন্ত’ পিছিয়ে যেতে পারে।
দুটি ব্যবস্থার তুলনা
ক্লার্কের ভাষ্য অনুযায়ী, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ব্যবস্থাটি অনেকটা উচ্চগতির রেলগাড়ির মতো এবং এটি ‘অনেক সহজ।’ অন্যদিকে স্টিম ক্যাটাপল্টে অনেক বেশি অংশ থাকে, যেমন ভালভ, প্রেশার রেগুলেটর ও পিস্টন। ক্লার্ক বলেন, ‘ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ব্যবস্থাটি নিজেই প্রমাণ করেছে যে এটি পরিচালনা করা সহজ এবং জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণের দিক থেকে সাশ্রয়ী। তাই ফোর্ড শ্রেণির রণতরিতে নৌবাহিনী বছরে ১০ কোটি ডলার সাশ্রয় করেছে।’
মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলে হোয়াইট হাউসের একজন মুখপাত্র সিএনএনকে ফ্যাক্টশিটের কথা উল্লেখ করেন। এতে দাবি করা হয়েছে, স্মারকটির উদ্দেশ্য হলো নৌবাহিনীর জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি জটিল সমস্যাগুলো সমাধান করা।
স্টিম ও ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ক্যাটাপল্টের বিষয়টি নিয়ে বহু বছর ধরেই মনোযোগী ট্রাম্প। গত মাসে এক অনুষ্ঠানে তিনি দাবি করেছিলেন, আধুনিক এ প্রযুক্তি মেরামত করা কঠিন।
জুলাইয়ে ‘ডিফেন্স অ্যান্ড ইনোভেশন সামিটে’ ট্রাম্প বলেন, ‘এগুলো কাছাকাছিও ভালো নয়, খুব জটিল। আসলে ক্যাটাপল্টগুলো কাজ না করায় আমাদের দুবার জাহাজ ফিরিয়ে আনতে হয়েছে। যখন সামান্য পানিও ম্যাগনেটে লাগে, এটি আর কাজ করে না। আপনি আটলান্টিক মহাসাগরে ৬০ ফুট উঁচু ঢেউয়ের মাঝে আছেন, প্রশান্ত মহাসাগরে ৭০ ফুট উঁচু ঢেউয়ে আছেন, আর তারা ম্যাগনেটের কথা বলছেন।’
‘একেবারে সেকেলে চিন্তা’
নৌ বিষয়ক প্রবীণ সাংবাদিক ও পডকাস্ট উপস্থাপক ক্রিস কাভাস বলেছেন, তিনি ইএমএএলএস ও স্টিম ক্যাটাপল্ট উভয়ের মাধ্যমে উৎক্ষেপণে ছিলেন। তার মতে, এ স্মারকটি ‘অত্যন্ত পুরনো ধরনের চিন্তা, একেবারেই সেকেলে।’
ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ব্যবস্থা প্রসঙ্গে কাভাস বলেন, ‘আমি সরাসরি বলতে পারি, আপনি পার্থক্যটি অনুভব করতে পারবেন। পার্থক্য হলো এটি অনেক বেশি মসৃণ। উড়োজাহাজের ওপর চাপ অনেক কম পড়ে।’
কাভাস ও ক্লার্ক উভয়েই জানিয়েছেন, স্টিম ক্যাটাপল্ট বানানোর মতো নির্মাতা খুঁজে পাওয়ার লজিস্টিক সমস্যায় পড়েছে নৌবাহিনী। কাভাস সিএনএনকে জানিয়েছেন, ইএমএএলএসের জন্য চুক্তিভিত্তিক নির্মাতা থাকলেও স্টিম ক্যাটাপল্ট নৌবাহিনী নিজেরাই তৈরি করত।
২০০৯ সালে সেবায় আসা রণতরি ‘জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের’ প্রসঙ্গে কাভাস বলেন, ‘এর পর থেকে তাদের নতুন কোনো স্টিম ক্যাটাপল্ট বানাতে হয়নি। সেটি অনেক দিন আগের কথা এবং সেই সব অবকাঠামো এখন নেই।’
একইভাবে ক্লার্ক বলেন, ‘এখন আর কেউই এগুলো বানায় না। যুক্তরাষ্ট্রে আর কোনো স্টিম ক্যাটাপল্ট নির্মাতা নেই। তাই তাদের সেই উৎপাদন লাইন আবারও চালু করতে হবে, যার জন্য কয়েক কোটি ডলার খরচ হবে। এবং এটি চালু করে প্রথম ক্যাটাপল্ট বানাতে কয়েক বছর সময় লাগবে।’
ক্লার্ক আরও যোগ করেন, ‘ইউএসএস ডরিস মিলারের’ দেরি এবং নিমিটজ-শ্রেণির রণতরিগুলোর অবসরের কারণে আগামী দশকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ‘বহন সক্ষমতায় ব্যাপকভাবে ঘাটতিতে পড়বে।’
অবসরপ্রাপ্ত নৌ ক্যাপ্টেন ও ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক কেলি বৃহস্পতিবার এক্সে দেয়া এক পোস্টে এই স্মারকের সমালোচনা করেছেন। তিনি লেখেন, ‘আমি শত শত বার বিমানবাহী রণতরি থেকে উৎক্ষেপণ করেছি, বিমান প্রকৌশলে আমার স্নাতকোত্তর ডিগ্রি আছে এবং আমি একজন টেস্ট পাইলট। তারপরও আমি নৌবাহিনীকে বলব না যে তাদের জাহাজে নির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা কীভাবে বানাতে হবে।’
তিনি আরও লেখেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের উচিত সে বিষয়গুলোতেই থাকা যা তিনি সবচেয়ে ভালো জানেন।’





