সাইবার অপরাধীদের বিরুদ্ধে বেসরকারি হ্যাকারদের নামাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন

কয়েকটি দেশের তথ্য চুরির চেষ্টা উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের
কয়েকটি দেশের তথ্য চুরির চেষ্টা উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের | ছবি: সংগ্রহীত
0

বিদেশি সাইবার অপরাধী গোষ্ঠীকে হ্যাক করার সুযোগ এখন থেকে বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে দেবে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রে এমন পদক্ষেপ কার্যত এই প্রথম বলে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি করেছে। কারো মতে এটি সফল হতে পারে, আবার কেউ কেউ মনে করছেন এটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ১২ আগস্ট একটি স্মারকে (মেমোরান্ডাম) স্বাক্ষর করেছেন। এতে বিচার বিভাগ ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগকে নির্দিষ্ট কিছু মার্কিন কোম্পানিকে সীমান্ত অতিক্রমকারী অপরাধী সংগঠনের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি ও হামলার অনুমতি দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। স্ট্রেইট টাইমসের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

হোয়াইট হাউস এই পদক্ষেপের পেছনে র‌্যানসমওয়্যার, ‘সেক্সটরশন’ ও অনলাইন প্রতারণার কারণে মার্কিনদের ক্ষতির যুক্তি দেখিয়েছে। তাদের ভাষ্যমতে, ২০২৫ সালে এই ধরনের অপরাধে মার্কিনদের ২ হাজার কোটি (২০ বিলিয়ন) ডলারের বেশি ক্ষতি হয়েছে।

স্মারকে বেসরকারি অংশীদারদের হ্যাকারদের সার্ভার নামিয়ে ফেলা কিংবা তাদের যন্ত্রে গুপ্তচরবৃত্তির সফটওয়্যার (স্পাইওয়্যার) ঢুকিয়ে দেয়ার অনুমতি দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এসব অভিযানের প্রতিটির জন্য সরকারের পূর্বানুমতি নিতে হবে এবং কোম্পানিগুলোকে অন্তত ১০ লাখ ডলার জামানত জমা রাখতে হবে। মৃত্যু বা আঘাতের কারণ হতে পারে এমন যেকোনো ধরনের কাজ, একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে ‘বলপ্রয়োগের’ পর্যায়ে পড়ে এমন কাজও এর আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।

‘জলদস্যুতার’ যুগের সঙ্গে মিল
এই উদ্যোগের সঙ্গে ১৮ শতকের ‘প্রাইভেটিয়ারিং’-এর কিছু মিল রয়েছে। সে সময় সরকারগুলো বেসরকারি জাহাজ বা নাবিকদের শত্রুপক্ষের জাহাজে হামলা চালানোর অনুমতি দিত। মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করা বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবসের নীতি ও সরকারি বিষয়ক প্রধান আরি রেডবর্ড এএফপিকে বলেন, ‘বেসরকারি খাতের হাতে রয়েছে তথ্য। সরকারের হাতে রয়েছে ক্ষমতা।’ এই নতুন স্মারক ‘এই দুটিকে একসঙ্গে যুক্ত করছে।’

সাবেক এই ফেডারেল প্রসিকিউটর প্রাইভেটিয়ারিংয়ের সঙ্গে ঐতিহাসিক তুলনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, ‘প্রাইভেটিয়ারিং ভেঙে পড়েছিল কারণ বন্দর ছাড়ার পর কোনো জাহাজের ওপর নজরদারির উপায় ছিল না। আমরা এখন ১৮১২ সালের চেয়ে অনেক ভিন্ন পৃথিবীতে বাস করি। যে নজরদারি এক সময় বন্দরেই শেষ হয়ে যেত, তা এখন অভিযানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাশাপাশি চলে।’

তবে অন্য বিশেষজ্ঞরা এই যুক্তিতে দ্বিমত পোষণ করেছেন। ইউনিভার্সিটি অব সারের সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাপক অ্যালান উডওয়ার্ড বলেন, ‘আপনি কমিশন দিতে পারেন। কিন্তু আপনি আনুগত্য দিতে পারবেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রাইভেটিয়ারিং সম্পর্কে ইতিহাসের রায় ছিল এই যে এটি অনৈতিক নয়। বরং এটি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছিল যেখানে এর কারণে সমস্যা তৈরি হয়েছে এর সুবিধার চেয়ে অনেক বেশি।’

সিদ্ধান্তে ইউ-টার্ন
এই উদ্যোগ হোয়াইট হাউসের অবস্থান বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ‘দ্য রেকর্ড’ নামের একটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা গত মার্চে জানিয়েছিলেন, তারা ‘জলদস্যু দিয়ে জলদস্যুদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে আগ্রহী নয়।’ সাইবারস্কুপ নামের আরেকটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, জাতীয় সাইবার পরিচালক শন কেয়ার্নক্রসও এর আগে এই ধরনের প্রচেষ্টার জন্য বেসরকারি খাত ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছিলেন। মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে কী কারণে এই ইউ-টার্ন এলো, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষক এবং প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলের সাবেক সাইবার নিরাপত্তা কর্মকর্তা জেসন হিলি জানিয়েছেন, এই কর্মসূচিতে কিছু সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘তারা এটিকে আইনের শাসন দিয়ে সমর্থন করছেন। তাই আমি মনে করি না এটি খুব অস্বাভাবিক কিছু।’ তবে তার উদ্বেগ অন্যত্র। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ‘এই প্রশাসন সেসব সংস্থাকে ব্যবস্থাপনাগতভাবে দুর্বল করেছে, যারা এই ধরনের কাজে নজরদারি করতে পারত। যেমন অফিস অব দ্য ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স।’

মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টরা নিজেদের পণ্য রক্ষায় ইতোমধ্যেই সাইবার নিরাপত্তার কাজে ব্যাপকভাবে যুক্ত রয়েছে। হোয়াইট হাউসের এই কর্মসূচি তাদের আরও একধাপ এগিয়ে যেতে এবং বিচারিক নজরদারি ছাড়াই কেবল সরকারি নজরদারির অধীনে কাজ করার সুযোগ দেবে। এই বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে মাইক্রোসফট প্রতিক্রিয়া জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং গুগল এএফপির অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

উডওয়ার্ডের মতে, সরকার-অনুমোদিত এই হ্যাকিংয়ে অংশ নেয়া যেকোনো কোম্পানি ‘আর নিরপেক্ষ রক্ষাকর্তা হিসেবে থাকবে না, নিজেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।’ এই কর্মসূচির খুঁটিনাটি চূড়ান্ত করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসন ৬০ দিন সময় পেয়েছে। যদিও এর কিছু দিক গোপন থাকবে।

এএম