স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পার্বত্য গাংওন প্রদেশের কৃষকরা এক সপ্তাহ আগেও যেসব খেত সবুজ-সতেজ দেখেছিলেন, খুঁড়ে সেগুলোর ভেতর তোলার মতো কোনো ফসলই পাননি।
উত্তর কোরিয়ার সীমান্ত ঘেঁষা ইয়াংগু কাউন্টির হায়ানে চাষ করা লি সাং-হিউক স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যম এসবিএসকে বলেন, ‘এমন এক-দুটি খেত নয়। ভাষায় কীভাবে প্রকাশ করি? আমি খুবই বিমর্ষ।’
তিনি জানান, ৪০ বছরের কৃষিজীবনে তিনি এমন পরিস্থিতি দেখেননি। কাছেই বাজারে ভালো দামের অপেক্ষায় ফসল তুলতে দেরি করায় কয়েক হাজার ‘পিয়ং’ (একটি কোরীয় পরিমাপ, যা প্রায় ৩ দশমিক ৩ বর্গমিটারের সমান) জমির বাঁধাকপি খেতেই পুড়ে গেছে। পরে কৃষকরা সেগুলো মাটিতে চাষ করে মিশিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। এতে হাজার হাজার পাউন্ড মূল্যের কোটি ওন পরিমাণ ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
গাংওন প্রদেশের যেসব শহরে দুটি খামার অবস্থিত, সেই চুনচেয়ন, হংচেয়ন ও হোয়েংসেয়ংয়ে চলতি মাসে প্রথমবারের মতো ভয়াবহ তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
কৃষকরা জানিয়েছেন, শুধু সবজি নয়, ফল-ফসলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরাসরি সূর্যের তাপে আপেলের চামড়া পুড়ে ‘সানস্ক্যাল্ডে’ আক্রান্ত হচ্ছে ও রং বদলে যাচ্ছে এবং পিচগুলো ফেটে যাচ্ছে। আপেল চাষি চেয়ন জেয়ং-তে এসবিএসকে বলেন, ‘সেপ্টেম্বরের শেষে চুসেওক ফসল উৎসবের জন্য যে গাছগুলো লাল হয়ে ওঠার কথা ছিল, সেগুলোর বৃদ্ধিই থেমে গেছে। শুধু সূর্যের দিকে থাকা অংশটাই লাল হচ্ছে। এই তাপপ্রবাহ চললে সেগুলোর রং সাদা হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’
কোরিয়া ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, এ তাপপ্রবাহে দক্ষিণ কোরিয়ায় অন্তত ৩১ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া ৯ লাখের বেশি গবাদিপশু এবং ১৪ লাখ চাষের মাছেরও মৃত্যু হয়েছে।
গত ২ আগস্ট দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ইয়াংসানে তাপমাত্রা রেকর্ড হয় ৪২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ১৯০৪ সালে আধুনিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ শুরুর পর দেশটির সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। যুক্তরাজ্যের নিজস্ব সর্বোচ্চ রেকর্ড হলো ৪০ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ২০২২ সালের জুলাইয়ে লিংকনশায়ারের কনিংসবিতে রেকর্ড হয়েছিল।
নিজেরাও বাঁচতে পারছেন না চাষিরা
কেবল ফসল নয়, তাপপ্রবাহে চাষিরা নিজেরাও শারীরিক চাপে পড়েছেন। তারা জানিয়েছেন, সবচেয়ে গরমের সময়ে ঘরে থাকার সরকারি পরামর্শ তারা মানতে পারছেন না। কারণ, ততক্ষণে তাদের ফসল পচে যাচ্ছে। পিচ চাষি পার্ক ওন-সেয়ন বলেন, ‘তারা আমাদের দিনে বাইরে গিয়ে কাজ করতে বারণ করছেন, কিন্তু আমার এ পিচগুলো তো পচেই যাচ্ছে।’
প্রেসিডেন্ট লি জায়ে মিয়ং মন্ত্রিসভাকে বলেছেন, দেশটি এর আগে কখনো এমন আবহাওয়ার মুখোমুখি হয়নি। জাতীয় সংকট ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংস্কারের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই ধরনের চরম পরিস্থিতিই নতুন স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন মৃত্যু ও গবাদিপশুর ক্ষতির ওপরই কেন্দ্রীভূত রয়েছে। কর্মকর্তারা এখনো ফসলের ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করতে পারেননি। কৃষকরা ধারণা করছেন, দেশটির তিন দিনের শরৎকালীন ফসল উৎসব চুসেওকের আগে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বেড়ে যাবে। এই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার পরিবারগুলো উৎসবের খাবারের জন্য প্রচুর কেনাকাটা করে থাকে। ইতোমধ্যে দাম অনেক চড়া।
আলু হচ্ছে সেই সব ফসলের একটি, যেগুলোর ক্ষতির আশঙ্কার কথা গবেষকরা আগেই জানিয়ে রেখেছিলেন। লাইবনিজ সেন্টার ফর অ্যাগ্রিকালচারাল ল্যান্ডস্কেপ রিসার্চ এবং ব্রান্ডেনবার্গ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির বিজ্ঞানীদের ২০২৪ সালে ‘পটেটো রিসার্চ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ার গ্রীষ্মকালীন আলু ফসলের জন্য যেকোনো জলবায়ু পরিস্থিতিতেই তাপ-সহনশীল জাতের প্রয়োজন হবে। অন্যদিকে বসন্তকালের আলু আগে রোপণ করলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় আগেও তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছেছিল। তবে ঝড় এসে দেশটিকে ওই ভয়াবহ তাপপ্রবাহ থেকে সাময়িক স্বস্তি দিয়েছিল। জাপানের কয়েকটি স্থানে ৪০ ডিগ্রি বা তার বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে এবং দেশটির প্রথম ‘অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে গরম’ দিনের নথি ওঠানো হয়েছে। এ বছরই তাদের আবহাওয়া সংস্থা এ ক্যাটাগরি চালু করে।
হংকংয়ে তাপমাত্রা পৌঁছেছে ৩৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ১৮৮৪ সালে রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর সেখানকার সর্বোচ্চ। চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলের একটি আবহাওয়া কেন্দ্রে গত জুলাইয়ে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) সর্বশেষ ‘স্টেট অব দ্য ক্লাইমেট ইন এশিয়া’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এশিয়া গত ৩৫ বছরে তার আগের তিন দশকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে উষ্ণ হয়ে উঠছে।





