আইসিইউতে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স: আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে প্রাণহানির ঝুঁকি

ফার্মেসিতে বিক্রি হচ্ছে ওষুধ | ছবি: এখন টিভি
0

আইসিইউ'তে ভর্তি হওয়া ৪৯ শতাংশ রোগী অন্য ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। যার ৯০ শতাংশ রোগীকেই বাঁচানো যাচ্ছে না। আইসিডিডিআরবি-এর গবেষণায় উঠে এসেছে এই তথ্য। আইসিইই'তে ভর্তি অনেক রোগীর শরীরেই কাজ করছে না কোনো অ্যান্টিবায়োটিক। এদিকে, সারাদেশের ফার্মেসিতে গণহারে বিক্রি হচ্ছে জীবনরক্ষাকারী অ্যান্টিবায়োটিক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোন চিকিৎসক কোন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করতে পারবেন তা নির্ধারণ করে দেয়া জরুরি।

এটি ঢাকা মেডিকেলের ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগে ভর্তি ৪৬ বছর বয়সের এক রোগীর ব্লাড কালচার। বাজারে প্রচলিত ১৫ টি অ্যান্টিবায়োটিকের কোনোটিই আর কাজ করছে না তার শরীরে। এ বিভাগে ভর্তি আরও কয়েকজন রোগীর ব্লাড কালচারে দেখায় অধিকাংশ ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে।

একই অবস্থা রাজধানীর উদারাময় গবেষণা কেন্দ্র-আইসিডিডিআর'বি হাসপাতালের। আইসিইউতে ভর্তি ৭ রোগীর শরীরেই একাধিক অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স। শিশু হাসপাতালে মাত্র কয়েকদিন বয়সের শিশুর শরীরেও দেখা যায় ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি।

সম্প্রতি আইসিডিডিআর'বি রাজধানীর একটি সরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে থাকা রোগীদের সাত মাস ধরে করা গবেষণা প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, এক রোগে আক্রান্ত হয়ে আইসিইউতে ভর্তি হয়ে ৪৯ শতাংশ রোগী অন্য ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। যার ৯০ শতাংশ রোগীকেই বাঁচানো যায়নি।

আইসিডিডিআরবি-এর সহযোগী বিজ্ঞানী ডা. গাজী মো. সালাহউদ্দীন মামুন বলেন, প্রথমে কিন্তু তাদের মধ্যে তাদের শরীরে জীবাণুটা ছিল না। পরবর্তীতে তাদের এই অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুটা তাদের মধ্যে নতুন করে শরীরে এসেছে। প্রথম এবং সেকেন্ড লাইনের যেসব মানে যেসব অ্যান্টিবায়োটিক আছে, অর্থাৎ আমরা বলি যে বিটা-ল্যাকটাম এবং ফ্লুরোকুইনোলোন গ্রুপের যত ড্রাগ আছে, সমস্ত ড্রাগের বিরুদ্ধেই এই জীবাণুগুলো হচ্ছে রেজিস্ট্যান্ট ছিল আর কি।

জীবন রক্ষাকারী ওষুধ হয়ে উঠছে ওষুধ প্রতিরোধী। কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডোজ শেষ না করা, অকারণে সেবন, প্রানিদেহ থেকে খাবারের মাধ্যমে আসা, এমনকি প্রতিবছর উৎপাদিত হাজার হাজার ডোজ অ্যান্টিবায়োটিক যথাযথ প্রক্রিয়ায় ধ্বংস না হওয়ায় মানুষের শরীরে যমদূত হয়ে আসছে।

সারা দেশের ওষুধের দোকানে গণহারে বিক্রি হচ্ছে জীবনরক্ষাকারী অ্যান্টিবায়োটিক। প্রেসক্রিপশন ছাড়া এমন দেদারসে বিক্রি বন্ধে নেই কোন নজরদারি।

এতো গেলো সরাসরি অ্যান্টিবায়োটিক সেবন। কিন্তু পরোক্ষভাবেও মানবদেহ হয়ে উঠছে ভয়াবহ ওষুধ প্রতিরোধী। কিভাবে? সেটা খুঁজতে এখন টিভি যায় গাজীপুরের মাওনা এলাকায়, আশপাশের দোকানে সারি সারি অ্যান্টিবায়োটিক। বিক্রি হচ্ছে খামারিদের কাছে। খামারে গেলে ক্যামেরায় ধরা পড়লো অসংখ্য অ্যান্টিবায়োটিকের খালি কৌটা। নির্দিষ্ট ব্যবহারবিধি না মেনে এসব অ্যান্টিবায়োটিক দেন বলে জানান খামারিরা।

খামারিরা জানান, কোনো রোগ হয়ে গেলে এইটা থেকে হয়তো মুক্তি পাওয়া যায়। আবার দেখা যায় একবারে না হলে রিপিট ডোজ করতে হয়। যখন অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়াই, তখন ডিমটা ৫ দিন পরে খামার থেকে বা ৬ দিন পরে খামার থেকে সেল দেয়া হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানোর পর নির্ধারিত সময় পর্যন্ত প্রাণীর ডিম, দুধ বা মাংসে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি থাকে। এসময় সংগ্রহ করা ডিম দুধ ঢুকে পড়ছে মানুষের শরীরে। তবে খামারিদের দাবি কয়েকদিন রেখে দিয়েই বিক্রি করেন তারা।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রো-কেমিস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক ড. তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, তারা যেটাকে ব্যবহার করছে তার যে উইথড্রয়াল পিরিয়ড, অর্থাৎ ব্যবহার করার পরে তার এই মুরগিটা বা তার এই প্রাণীটা এইটা যেই একটা পিরিয়ড থাকার, গ্যাপ থাকার কথা এবং সেই গ্যাপ রেখে তার এটাকে জবাই করে এটা মার্কেটে আসার কথা, আমরা অনেক ক্ষেত্রেই কিন্তু দেখি যে তারা সেটিকে ফলো করে না। আমরা যেরকম কোনো ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকস ব্যবহারের আগে যে প্রেসক্রিপশন ছাড়া ব্যবহার করা উচিত না, ঠিক একইভাবে আমাদের প্রাণী ক্ষেত্রেও ওইটা প্রেসক্রিপশন ছাড়া এই ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকসগুলো কিন্তু ব্যবহার করা উচিত না।

এমন ওষুধ প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে বিপাকে পড়তে হয় চিকিৎসকদের। একাধিক এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করেও সংক্রমণ কমানো যায় না, এতে রোগী সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে আসছে।

আইসিডিডিআরবি-এর ক্লিনিক্যাল ও ডায়াগনস্টিক সার্ভিসের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. লুবাবা রহমান বলেন, পেশেন্টটা বাসায় চলে যেতে পারতো। সে বাসায় গিয়েও ভালো হচ্ছে না, আবার ফেরত আসছে। আমাদেরকে তখন আরও হায়ার অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হচ্ছে। কখনো কখনো এই অ্যান্টিবায়োটিকগুলো ওরাল ফর্মে অ্যাভেলেবল না, ইনজেকশন দিতে হচ্ছে। খরচ বাড়ছে। বাচ্চার মানে বাচ্চার জন্য আরও এটা মিজারেবল হচ্ছে। তাকে ইনজেক্টেবলের মাধ্যমে অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হচ্ছে, তাকে হাসপাতালে বেশি সময় বেশি দিনের জন্য রাখতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রেসক্রিপশন ছাড়া এন্টিবায়োটিক বিক্রয় নিষিদ্ধ, এমনকি কোন চিকিৎসক কোন ধরনের এন্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করতে পারবে তাও নির্ধারন করে দেয়া দরকার।

শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী জিয়াউল ইসলাম বলেন, ইনফেকশন ভালো হচ্ছে না, কাজ হচ্ছে না। তার মানে কি? অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না। অনেক বাচ্চা পাই কিন্তু আমরা। একটু বড় বাচ্চা, যাদের টাইফয়েড হলো বা ইউরিন ইনফেকশন হলো, তাদের দেখা গেল যে জ্বর যাচ্ছে না। অ্যান্টিবায়োটিক দিচ্ছি আমরা কাজ করছে না। মাল্টিপল অ্যান্টিবায়োটিক দিচ্ছি কাজ করছে না। ইনফেকশনটা জটিল আকার ধারণ করলো এবং আলটিমেটলি দেখা গেল সেপটিক হয়ে সেপটিক শক হয়ে রোগীটা মারাও যাচ্ছে কিন্তু।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফেরদৌস রহমান বলেন, রিজার্ভ অ্যান্টিবায়োটিক যেটা বলা হয়, শুধু আইসিইউ রোগীদের জন্য, শুধু ক্রিটিক্যাল পেশেন্টদের জন্য, সেগুলো এখন দোকানে মার্কেটে অ্যাভেলেবল। একজন দেখা যায় গ্রাম্য চিকিৎসকও, এমবিবিএস ডাক্তারও এগুলো ইউজ করে ফেলেছে, যেগুলো আইসিইউতে এক্সপার্টদের ইউজ করার কথা। দোকানে আনঅ্যাভেলেবল করে ফেলতে হবে। সব দোকানে সব অ্যান্টিবায়োটিক রাখতে পারবে না। চাইলেই যেন আমি ৫০ টাকা দিয়ে দুইটা অ্যান্টিবায়োটিক কিনতে না পারি।

অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে অচিরেই সাধারণ জ্বর সর্দির মতো সংক্রমণও মহামারী আকারে দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ইএ