হাতে থাকার কথা বই খাতা, দু’চোখ ভরে স্বপ্ন দেখার কথা- ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার অথবা স্বাবলম্বী হওয়ার। অথচ দরিদ্রতা আর পারিবারিক বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে অপ্রাপ্ত বয়সে অনেক কিশোরীর কাঁধে তুলে দেয়া হচ্ছে সংসারের হাল। পরিবার ভাবছে এতে নিশ্চিত হবে কন্যার ভবিষ্যৎ। কিন্তু ঘটছে উল্টো ঘটনা।
বিয়ে হওয়া একজন কিশোরী বলেন, ‘আমার ১৪ বছর বয়সেই বিয়ে হয়েছে। আমার বাবা-মা জোর করে আমাকে বিয়ে দিয়েছে। তাদের ছেলে পছন্দ হয়েছে, আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল, আমি মানি নাই। পরে ওরা হুট করে আমার বিয়ে ঠিকঠাক করে বিয়ে দিয়ে দেয়। আমার স্বপ্ন ছিল আমি বড় হয়ে ডাক্তার হতাম, পড়াশোনা করতাম।’
উল্টো ঘটনাও যে নেই তাও নয়। নিজের বিয়ে নিজে বন্ধ করার উদাহরণও রয়েছে। সেক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার মাঝে কেউ কেউ সেটা উৎরেও যেতে পারেন।
বাল্যবিবাহ থামানো একজন কিশোরী বলেন, আমি যখন অ্যাজ এ ভিকটিম ছিলাম তখন আমি যেহেতু বাল্যবিবাহ কাকে বলে এবং বাল্যবিবাহের যে ২১টা ক্ষতি রয়েছে আমি জানি। আমি যেহেতু জানি—তো আমি তো জেনে-শুনে আমি তো নিজেকে আর গর্তের মধ্যে ফেলে দেব না।’
আরও পড়ুন:
সচেতনতামূলক সভা সেমিনার, উঠান বৈঠক নিয়মিত হলেও, স্থানীয়দের মতে সেখানে পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সদস্যদের অংশগ্রহণ খুবই কম। এ ব্যাপারে বিয়ে পড়ানো কাজীদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেবার পরামর্শ প্রতিরোধ কমিটির।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির সদস্যদের একজন বলেন, ‘কোন কাজী বিয়েটা পড়াচ্ছে, কোন সরকারি কাজী বিয়েটা পড়াচ্ছে—সে তথ্যটা নেবে। আর যদি ওই সরকারি কাজীর মধ্যে কোনো কাজী বিয়েটা পড়াচ্ছে না, তখন সেই ইউনিয়নের সেই কাজীই বা সেই জেলার সেই কাজীই তথ্যটা বের করবে। তারপর ওই কাজীর ঠিকানা স্যার ইউএনও স্যারকে দেবেন। এরকম আমরা কথা বলেছি স্যারের সঙ্গে, তারপর স্যার ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু বিয়ে বন্ধ করলেই হবে না। কিশোরীদের নিরাপদ আশ্রয়, পরিবারকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা ও নিয়মিত কাউন্সিলিং সুবিধা। ভুক্তভোগীকে শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা এবং সচেতনতা সভায় পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সদস্যদের সম্পৃক্ততা।
নীলফামারী মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আনিসুর রহমান বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের মেম্বার ইনভাইটেড হয়, অর চেয়ারম্যান ইনভাইটেড হয়, তাহলে উনারা কিন্তু জানলে তখন আমরা যদি আমাদেরকে অবগত করেন কিংবা ওই ওয়ার্ডের কেউ যদি আমাদেরকে অবগত করেন—তখন হয়তো আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সেটা যত কষ্টই হোক আমরা চেষ্টা করি সেখানে যাওয়ার জন্য। এখন ওই সংশ্লিষ্ট জনগণ যদি না জানায় কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা যদি আমাদেরকে অবগত না করেন, তাহলে আসলে তো আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়।’
একটি বিয়ে কয়েক ঘণ্টার অভিযানে বন্ধ করা গেলেও একজন কিশোরীর ভবিষ্যৎ গড়তে লাগে বছরের পর বছর। প্রশ্ন একটাই, রাষ্ট্র কি শুধু বিয়ে থামিয়েই তার দায়িত্ব শেষ করবে? নাকি নিশ্চিত করবে সেই মেয়েটির নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষা আর সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকারও?





