শিল্প ও অর্থনীতিতে গ্যাস সংকটের থাবা: ব্যাহত উৎপাদন ও অর্থনীতি

গ্যাসের জন্য পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইন
গ্যাসের জন্য পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইন | ছবি: এখন টিভি
0

দেশজুড়ে অব্যাহত গ্যাস সংকটে বিপর্যস্ত সাধারণ মানুষ। ব্যাহত হচ্ছে রান্না থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন। ব্যবসায়ীদের দাবি, বাণিজ্য ঘাটতি নিরসনে শিল্পখাতে দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। আর অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ ও কর্মসংস্থান তৈরির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জ্বালানি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া জরুরি। এদিকে, সংকট মোকাবিলায় দেশে গ্যাসকূপ খনন ও উত্তোলনে জোর দেয়ার তাগিদ জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের।

গ্যাস নেই। থমকে আছে চাকা। গ্রাহকের অপেক্ষা যেন নিরন্তর।

জ্বলছে না চুলা। সময়মতো রান্না করাও দুষ্কর এখন। কি আবাসিক, কি যানবাহন-গ্যাসের অভাবে মুখ থুবড়ে পড়ার দশা শিল্প-কারখানারও।

পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিদিন প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ২১৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস। পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে পোশাক কারখানার উৎপাদন কমেছে ৪০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত। ক্রয়াদেশ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।

পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি যোগানের অভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে উৎপাদন ব্যবস্থা। এমন বাস্তবতায় দেশের অর্থনীতি রক্ষায় গার্মেন্টস ও বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি নিরসনে জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন করার দাবি তাদের।

সেভানটেক্স এশিয়া লিমিটেডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফেরদৌস ইসলাম বলেন, ‘আমাদের ফ্যাক্টরিগুলো ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা চালাবার কথা। কিন্তু গ্যাসের প্রেশার এত লো, ম্যান পাওয়ার তো আমার ঠিকই ইনভলভ ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা, তাকে পে করতে হচ্ছে। কখনো ওভারটাইম করতে হচ্ছে। তো ইন দ্য মিনটাইম কী হয় যে, হিউজ পরিমাণ যারা ওনাররা আছে তাদেরকে কিন্তু দে হ্যাভ টু পে। এ জায়গাতেই কিন্তু ওই যে এমপ্লয়িদের কস্টিং ওভারহেড বাড়ছে। এমপ্লয়ি তো আর বসে নাই, তাদেরকে তো পেট তো কারও বসে নাই।’

আরও পড়ুন:

বিটিএমইএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘বিদ্যুৎ দরকার, গ্যাস দরকার। ঋণ এটা এবং আমাদের নতুন করে অর্থায়নও করতে হবে সরকারকে। যাতে আমরা ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল পাই, কাঁচামাল কিনতে পারি, ফ্যাক্টরি আবার চালু করতে পারি।’

অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, শিল্পের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানির যোগান জরুরি। কোন কারণে বাধাগ্রস্ত হলে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে সরকার। এমন অবস্থায় কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে বিদেশি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহাদাৎ হোসেন সিদ্দিকী বলেন, ‘প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান দুটো আমরা বলি যে সমমুখী সম্পর্ক। অতএব, এই সমমুখী সম্পর্কটাকে যদি বাস্তবে রূপ দিতে হয়, তাহলে শিল্পের বিকল্প নেই। আর শিল্প—আপনি ফুয়েল ছাড়া, মানে জ্বালানি নিরাপত্তা ছাড়া আপনি চিন্তাও করতে পারেন না।’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও উত্তোলনের ক্ষেত্রে উদ্যোগী নয় নীতিনির্ধারকরা। সংকট মোকাবিলায় আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার এখনই সময়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. বদরূল ইমাম বলেন, ‘গ্যাস এক্সপ্লোরেশন এমন একটা জিনিস যে আপনার গ্যাস বা অয়েল এক্সপ্লোরেশন, এখানে আপনি যখন প্রোগ্রাম শুরু করবেন, ড্রিলিং শুরু করবেন, তখন আপনার দুইটা-তিনটা ড্রিলিং ড্রাই হতেই পারে। কিন্তু আপনাকে চালায় যেতে হবে। ইভেনচুয়ালি আপনি বিরাট আবিষ্কার করবেন। এখানে আমাদের সমস্যা হচ্ছে—একটা ড্রিলিং করলাম, দুইটা ড্রিলিং করলাম, যদি না পাই তাহলে আমরা মনে করি যে এখানে আর কিছু নাই। সুতরাং ওই যে ওই যে বড় আকারের একটা উদ্যোগ নিয়ে প্রোগ্রামটা নেওয়া, ওইটা নেয়া হয় না। এইটাই আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা।’

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরের মতোই আশ্বাস-শিগগিরই দূর হবে সংকট।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘গ্যাসের এই সাপ্লাইটা যখনই রিস্টোরড হয়ে যায়, তাহলে এই যে বিদ্যুতের অতিরিক্ত যে চাহিদাগুলো আছে সেগুলো কমে যাবে এবং গ্যাসের যে সংকট আমরা ফেস করছি, সেই সংকটটা আশা করি থাকবে না।’

রপ্তানিমুখী বাণিজ্য চাঙ্গা রাখতে জ্বালানি নিরাপত্তার বিকল্প নেই। আর তাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সমস্যা সমাধানের তাগিদ বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের।

ইএ