স্যাটেলাইট ছবির ভিত্তিতে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানায়, গত কয়েক মাসে ইসরাইলি বাহিনী ফিলিস্তিনি জনপদ ধ্বংস করে ওই বাঁধ নির্মাণ করেছে। প্রায় ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ গাজা উপত্যকার অর্ধেকের বেশি অংশজুড়ে এ নির্মাণকাজ এগিয়েছে।
স্যাটেলাইট ছবি দেখানোর পর ইসরাইলি সামরিক বাহিনী এপিকে নিশ্চিত করেছে, তারা তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ এলাকায় একটি ভৌত প্রতিবন্ধক নির্মাণ করেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে হামাসের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় ইসরাইলি সেনারা যে সীমারেখা পর্যন্ত সরে গিয়েছিল, সেটিই ‘ইয়েলো লাইন’ নামে পরিচিত। ওই চুক্তিতে এটি সাময়িক সীমারেখা হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে ইসরাইলি সেনা আরও পিছু হটবে বলে উল্লেখ ছিল।
তবে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন স্থবির হয়ে পড়ায় ফিলিস্তিনিদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, সাময়িক এই সীমারেখাই স্থায়ী সীমান্তে পরিণত হতে পারে। যুদ্ধবিরতি তদারকির দায়িত্বে থাকা সেন্টকম কিংবা ভবিষ্যতে গাজার প্রশাসনিক তদারকির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত বোর্ড অব পিস কোনো পক্ষই এ বিষয়ে মন্তব্য করেনি।
ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, বাঁধের পাশাপাশি ওই এলাকায় গোয়েন্দা ও প্রযুক্তিনির্ভর সরঞ্জামসহ একটি ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ গড়ে তোলা হয়েছে। বাঁধটি কত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে, সে বিষয়ে তারা বিস্তারিত জানায়নি। তাদের দাবি, অনুপ্রবেশ ঠেকানো এবং গাজার কাছে অবস্থানরত ইসরাইলি সেনা ও সীমান্তবর্তী জনপদ রক্ষাই এর উদ্দেশ্য।
স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, দক্ষিণ গাজার একটি অংশে মাত্র দুই সপ্তাহে দুই কিলোমিটারের বেশি নতুন বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। ১ জুলাই সেখানে প্রায় ৫০০ মিটার দীর্ঘ বাঁধ ছিল। ১৫ জুলাই সেটি বেড়ে প্রায় ২ দশমিক ৪ কিলোমিটারে পৌঁছায়। এর ফলে ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণাধীন রাফাহর ধ্বংসস্তূপ এবং বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের বড় তাঁবুশিবিরগুলোর অন্যতম আল-মাওয়াসি এলাকার মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়েছে।
বর্তমান গতিতে নির্মাণকাজ চললে এটি দক্ষিণের খান ইউনিস থেকে গাজা সিটির উপকণ্ঠ পর্যন্ত প্রায় ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সবচেয়ে বড় অংশের সঙ্গে যুক্ত হবে। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ওই অংশের নির্মাণকাজ এখনো চলছে। জুনের শেষ থেকে জুলাইয়ের শুরু পর্যন্ত এক কিলোমিটারের বেশি নতুন অংশ যোগ হয়েছে।
গাজার উত্তরাঞ্চলের বেইত লাহিয়ার কাছেও কয়েকটি বিচ্ছিন্ন মাটির বাঁধ দেখা গেছে। কোথাও কোথাও এসব বাঁধ ‘ইয়েলো লাইন’-এর বাইরেও বিস্তৃত বলে স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়।
বর্তমানে গাজার জনসংখ্যার বড় অংশ ‘ইয়েলো লাইন’-এর পশ্চিমে উপকূলীয় এলাকায় অবস্থান করছে। অধিকাংশ মানুষ অস্বাস্থ্যকর তাঁবুশিবিরে বসবাস করছেন এবং মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
অন্যদিকে স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় বুলডোজার ও বিস্ফোরক ব্যবহার করে অধিকাংশ ভবন গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। একসময় আড়াই লাখের বেশি মানুষের বাস ছিল এমন রাফাহসহ কয়েকটি শহর প্রায় সম্পূর্ণ মুছে গেছে। সেখানে নতুন সড়ক ও সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হয়েছে। কৃষিজমিরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ইসরাইলি বাহিনীর দাবি, হামাসের ব্যবহৃত অবকাঠামো ধ্বংস করতেই এসব অভিযান চালানো হচ্ছে।
ইসরাইলি বাহিনী জানিয়েছে, ‘ইয়েলো লাইন’-এর অবস্থান স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করার কাজ চলছে, যাতে ‘অপ্রয়োজনীয় সংঘর্ষ কমানো এবং নিরীহ মানুষের ক্ষতি এড়ানো’ যায়।
তবে এপি বলছে, ওই সীমারেখার কাছে যাওয়া বা তা অতিক্রম করার সময় ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে ফিলিস্তিনিরা নিহত হয়েছেন। ইসরাইলি বাহিনীর দাবি, তারা কেবল তাদের সেনাদের জন্য হুমকি মনে হওয়া সশস্ত্র ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। তবে নিহতদের মধ্যে শিশু ও সীমারেখা সম্পর্কে অজ্ঞ বেসামরিক নাগরিকও ছিলেন। কিছু ইসরাইলি সেনা জানিয়েছেন, অনেক সময় তারা কাদের লক্ষ্য করে গুলি করছেন তা জানতেন না এবং সীমারেখা অতিক্রমকারী সবাইকে গুলি করার নির্দেশ ছিল।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি হামলায় এক হাজার ১০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের বেশির ভাগই বিমান ও ড্রোন হামলার শিকার। ইসরাইলি বাহিনীর দাবি, তারা সশস্ত্র যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। একই সময়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলায় পাঁচজন ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছেন।
যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত গাজার একেবারে প্রান্তসীমায় ইসরাইলি সেনা সরে যাওয়ার কথা ছিল এবং তাদের জায়গায় একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী দায়িত্ব নেবে। তবে কয়েক মাস ধরে সেই প্রক্রিয়া স্থবির রয়েছে।
বর্তমানে যুদ্ধবিরতি সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা জাতিসংঘের সাবেক এক কূটনীতিক এ স্থবিরতার জন্য হামাসের নিরস্ত্রীকরণে অগ্রগতি না হওয়ার বিষয়টিকে দায়ী করেছেন। অন্যদিকে হামাসের অভিযোগ, ইসরাইলই যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন যোদ্ধাদের হামলায় ইসরাইলে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন, যাদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক। এছাড়া ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এর জবাবে ইসরাইল সামরিক অভিযান শুরু করে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সেই অভিযানে এখন পর্যন্ত ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
হামাস-পরিচালিত সরকার সম্প্রতি বিলুপ্ত হলেও গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংগঠন সাধারণভাবে নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচনা করে। মন্ত্রণালয় বেসামরিক ও যোদ্ধাদের আলাদা করে হিসাব দেয় না। তবে তাদের দাবি, নিহতদের প্রায় অর্ধেকই নারী ও শিশু।





