বিদায় ‘স্যার’ স্যাম নিল: জুরাসিক পার্কের ‘ড. অ্যালান গ্রান্ট’ মারা গেছেন

জনপ্রিয় ও প্রবীণ অভিনেতা স্যার স্যাম
জনপ্রিয় ও প্রবীণ অভিনেতা স্যার স্যাম | ছবি: সংগৃহীত
0

হলিউড তথা বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রবীণ অভিনেতা স্যার স্যাম নিল মারা গেছেন। আজ (সোমবার, ১৩ জুলাই) ৭৮ বছর বয়সে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। ‘জুরাসিক পার্ক’, ‘দ্য পিয়ানো’, ‘পিকি ব্লাইন্ডার্স’-এর মতো কালজয়ী সিনেমা ও সিরিজে অভিনয় করা এই নিউজিল্যান্ডের তারকার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে তার পরিবার।

পরিবারের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এসময় তার পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন। মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ না করা হলেও পরিবার একে ‘আকস্মিক’ বলে জানিয়েছে। তবে মৃত্যুর সময় তিনি সম্পূর্ণ ক্যানসারমুক্ত ছিলেন।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ এক শোকবার্তায় বলেন, ‘স্যাম নিল অসংখ্য প্রিয় অস্ট্রেলীয় গল্পের অংশ ছিলেন। তার অভিনয়, রসবোধ ও ব্যক্তিত্ব তাকে দর্শকের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে দিয়েছে।’

২০২৩ সালে প্রকাশিত নিজের আত্মজীবনী ‘ডিড আই এভার টেল ইউ অ্যাবাউট দিস?’-এ স্যাম নিল প্রকাশ করেছিলেন যে, ২০২২ সালে তার শরীরে ‘অ্যাঞ্জিওইমিউনোব্লাস্টিক টি-সেল লিম্ফোমা’ (একধরনের বিরল রক্তের ক্যানসার) ধরা পড়ে। দীর্ঘ ও জটিল চিকিৎসার পর রোগটি নিয়ন্ত্রণে এলেও তাকে নিয়মিত চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে থাকতে হচ্ছিল।

ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের দিনগুলোতে এক সাক্ষাৎকারে জীবনের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করে তিনি বলেছিলেন, ‘মরতে আমার ভয় নেই। তবে বিষয়টা আমাকে বিরক্ত করবে। কারণ, আমি আরও ১০-২০ বছর বাঁচতে চাই। নাতি-নাতনিদের বড় হতে দেখতে চাই। আমি যে গাছগুলো লাগিয়েছি, সেগুলো বড় হতে দেখতে চাই।’

১৯৪৭ সালে উত্তর আয়ারল্যান্ডের ওমাহ শহরে জন্ম নেয়া স্যাম নিলের জন্মনাম ছিল নাইজেল জন ডারমট নিল। ১৯৫৪ সালে তার পরিবার নিউ জিল্যান্ডে চলে যায়। স্কুলজীবনে একই নামের জটিলতা এড়াতে মাত্র ১২ বছর বয়সে নিজের নাম বদলে রাখেন ‘স্যাম’। আইন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও তা শেষ না করে থিয়েটারে নাম লেখান। নিউ জিল্যান্ডের ডাউনস্টেজ থিয়েটারে যখন পেশাদার অভিনয় শুরু করেন, তখন সপ্তাহে তার বেতন ছিল মাত্র ৩৫ ডলার! কখনো কখনো পারিশ্রমিক হিসেবে জুটত দর্শকের জন্য রান্না করা খাবারের অতিরিক্ত অংশ।

১৯৭৭ সালে ‘স্লিপিং ডগস’ সিনেমা দিয়ে আলোচনায় আসার পর ‘দ্য হান্ট ফর রেড অক্টোবর’সহ বেশ কিছু ছবিতে নিজের অবস্থান শক্ত করেন। এমনকি আশির দশকে জেমস বন্ড চরিত্রের জন্য অন্যতম শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দী ছিলেন তিনি। ১৯৮৬ সালে বন্ড চরিত্রের জন্য স্ক্রিন টেস্টও দিয়েছিলেন, যদিও শেষ পর্যন্ত চরিত্রটি পান টিমোথি ডাল্টন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্যাম নিলের সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ১৯৯৩ সালে। সে বছর ‘দ্য পিয়ানো’ ছবিতে তার অভিনয় প্রশংসিত হয়। একই বছর স্টিভেন স্পিলবার্গ পরিচালিত সর্বকালের অন্যতম সেরা ব্লকবাস্টার ‘জুরাসিক পার্ক’-এ ড. অ্যালান গ্রান্ট চরিত্রে অভিনয় করে বিশ্বজুড়ে তারকাখ্যাতি পান তিনি। মজার ব্যাপার হলো, এ চরিত্রটি প্রথমে হ্যারিসন ফোর্ডকে প্রস্তাব করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি ফিরিয়ে দেয়ার পর তা স্যাম নিলের ক্যারিয়ারের সেরা মাইলফলক হয়ে দাঁড়ায়। পরে ‘জুরাসিক পার্ক ৩’ ও ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড ডোমিনিয়ন’-এও তিনি একই চরিত্রে অভিনয় করেন।

৫ দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ১৫০টির বেশি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন প্রযোজনায় অভিনয় করেছেন তিনি। এর মধ্যে বিশ্বখ্যাত ক্রাইম ড্রামা সিরিজ ‘পিকি ব্লাইন্ডার্স’-এ দুর্নীতিগ্রস্ত মেজর চেস্টার ক্যাম্পবেল চরিত্রে তার নেতিবাচক অভিনয় তুমুল সমাদৃত হয়।

অভিনয়ের বাইরে নিউ জিল্যান্ডের সেন্ট্রাল ওটাগো অঞ্চলে নিজের আঙুরখেত ও ওয়াইনারি পরিচালনা করতেন স্যাম নিল। ব্যক্তিজীবনে দারুণ রসবোধের জন্য পরিচিত এই অভিনেতা নিজের খামারের বিভিন্ন প্রাণির নাম রাখতেন বিখ্যাত সহশিল্পীদের নামে! তার খামারের একটি মুরগির নাম ছিল লরা ডার্ন, একটি হাঁসের নাম কাইলি মিনোগ, আর একটি গরুর নাম ছিল হেলেনা বোনহাম কার্টার।

অভিনয়ে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯১ সালে তিনি ‘অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার’ (ওবিই) সম্মানে ভূষিত হন। ২০২২ সালে তিনি লাভ করেন ব্রিটেনের সর্বোচ্চ সম্মানজনক ‘নাইটহুড’, যার ফলে তার নামের আগে যুক্ত হয় ‘স্যার’ উপাধি। মৃত্যুকালে তিনি চার সন্তান ও ছয় নাতি-নাতনিসহ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্ত-অনুরাগী রেখে গেছেন।

এএইচ